আমাদের বর্তমান গ্রন্থের বিষয় শাক্ত পুরাণ ও তন্ত্রাদিতে বর্ণিত সৃষ্টিতত্ত্ব। শক্তি বা দেবীভাবনাকে কেন্দ্র করে যে সমস্ত উপাসনা ও সাধনধারা রয়েছে, তৎসম্বন্ধীয় গ্রন্থগুলোতে জগতের উৎপত্তি কীভাবে বর্ণিত; এবং সেই জগৎসৃষ্টিপক্রিয়ায় দেবীর স্থান ও ভূমিকা কী এই নিয়েই এখানে আলোচনা করা হবে। শাক্ত ধর্ম সম্বন্ধীয় পৌরাণিক আখ্যান কিংবা দার্শনিক সিদ্ধান্ত, সমস্ত কিছুকে তাদের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পরিপ্রেক্ষিতে রেখে পর্যবেক্ষণ করা হবে। তবে এই প্রসঙ্গে মনে রাখা উচিত যে শক্তিবিষয়ক হলেই কোনও আখ্যান বা দার্শনিক সিদ্ধান্ত ‘শাক্ত’ পদবাচ্য হয় না। মূলস্রোতীয় পুরাণে বহুস্থানে দেবী বা শক্তির উপস্থিতি দেখা যায়। কৃষ্ণজন্ম আখ্যানে দেবী নিদ্রা বা যোগমায়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কিংবা শিবের দাম্পত্য জীবনমূলক আখ্যানগুলোর সমস্তটাই সতী বা পার্বতীকে ঘিরে। বিশেষ করে কালিদাসকৃত কুমারসম্ভবম্-এ পার্বতী কী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, তা বলা বাহুল্য। কিন্তু তৎসত্ত্বেও এগুলোকে ‘শাক্ত’ আখ্যান বলা চলে না। তার কারণ, এখানে শক্তির যাবতীয় কার্য বিষ্ণু কিংবা শিবের অনুগতা দাসী, ভক্ত, সেবিকা, উপাসিকা, প্রেয়সী কিংবা পত্নী রূপে। দার্শনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও দেখা যায় যে বৈষ্ণব পাঞ্চরাত্র কিংবা শৈবাগমে বর্ণিত সমস্ত সৃষ্টিতত্ত্ব শক্তিবাদভিত্তিক। পরবাসুদেব কিংবা পরমশিবের সঙ্গে অভিন্না শক্তিই সমস্ত সৃষ্টির মূল। কিন্তু তবু এগুলো প্রকৃত অর্থে ‘শাক্ত’ নয়, কারণ পরমকারণরূপী দেবতার সঙ্গে শক্তি অভিন্ন রূপে যুক্ত থাকলেও পরতত্ত্ব এখানে শক্তিবিশিষ্ট বিষ্ণু বা শিব। যদিও আমরা গ্রন্থের অধ্যায়গুলোতে দেখব যে অদ্বৈতবাদী শৈবদর্শনে শিব ও শক্তির অভেদত্বের ভিত্তিতে স্থানবিশেষে শক্তিকেও পরম কারণ বলে স্বীকার করা হয়েছে, তবু শৈবাগমের মৌলিক সিদ্ধান্তে শক্তিযুক্ত শিবই পরতত্ত্ব।
বইটির ছত্রে ছত্রে লেখকের সুচারু বিশ্লেষণ পদ্ধতি এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা পাঠকদের মুগ্ধ করবে বলেই আমরা আশা রাখি।
Reviews
Clear filtersThere are no reviews yet.