সত্যযুগের কথা।
মহাজাগতিক এক সন্ধিক্ষণে পৃথিবী তখন কম্পমান। একদিকে দেবতাদের অমৃতের তৃষ্ণা, অন্যদিকে অসুরদের অমরত্বের আকাঙ্ক্ষা। ক্ষীরসমুদ্র মন্থন শুরু হলো। মন্থনদণ্ড হলো বিশাল মন্দার পর্বত, আর রজ্জু হলেন নাগরাজ বাসুকি। দেবতা ও অসুরদের সম্মিলিত টানে সমুদ্রের বুক চিরে একে একে উঠে আসতে লাগল রত্নরাজি—উচ্চৈঃশ্রবা অশ্ব, ঐরাবত হস্তী, পারিজাত পুষ্প। কিন্তু প্রকৃতির নিয়ম হলো, সৃষ্টির আগে ধ্বংসকে মোকাবিলা করতে হয়। অমৃত ওঠার আগে উঠল বিষ—হলাহল।
সেই বিষ কোনো সাধারণ সাপের বিষ ছিল না। সেটি ছিল সৃষ্টির ‘অ্যান্টি-ম্যাটার’ বা প্রতি-পদার্থ। তার গন্ধে দেবতারা মূর্ছিত হলেন, অসুরদের কালো শরীর পুড়ে ছাই হতে লাগল। সেই তীব্র বিষের জ্বালায় সৃষ্টি যখন ধ্বংস হওয়ার মুখে, তখন দেবাদিদেব মহাদেব এগিয়ে এলেন। তিনি সেই প্রলয়ঙ্করী বিষ নিজের কণ্ঠে ধারণ করলেন। বিষের জ্বালায় তাঁর কণ্ঠ নীল হয়ে গেল, তিনি হলেন নীলকণ্ঠ।
কিন্তু এই প্রচলিত গল্পের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অন্য সত্য, যা কেবল তান্ত্রিকরা জানেন।
মহাদেব যখন সেই হলাহল পান করছিলেন, তখন তাঁর শরীর থরথর করে কাঁপছিল। সেই কম্পনের ফলে তাঁর হাতের তালু থেকে, বা হয়তো মুখের কষ বেয়ে এক ফোঁটা—মাত্র এক ফোঁটা—বিষ পৃথিবীর মাটিতে পড়েছিল। সেই বিষ কোনো সাধারণ মাটিতে পড়েনি; তা পড়েছিল হিমালয়ের পাদদেশে এক গোপন উপত্যকায়, যা দেবতাদেরও দৃষ্টির অগোচরে ছিল।
***
সূর্য ডুবেছে অন্তত ঘণ্টা দুয়েক হলো, কিন্তু আকাশটা এখনো অদ্ভুত রকমের লাল। যেন কেউ দিগন্তের গায়ে এক বালতি কাঁচা রক্ত ঢেলে দিয়েছে, আর সেই রক্ত চুঁইয়ে চুঁইয়ে নামছে শাল আর মহুয়া বনের মাথায়। পুরুলিয়ার এই দিকটায় মাটির রঙ এমনিতেই সিঁদুরের মতো, কিন্তু আজ রাতের আঁধারে সেই লাল মাটি যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। বাতাস থমথমে, ভারী। নিঃশ্বাস নিতে গেলে মনে হয় ফুসফুসের ভেতরে গরম বালি ঢুকে যাচ্ছে। অথচ এখন কার্তিক মাস, হিম পড়ার কথা। কিন্তু ‘কালপল্লী’ গ্রামের আবহাওয়া ক্যালেন্ডারের তোয়াক্কা করে না।
একটা কালো স্করপিও গাড়ি হেডলাইটের তীব্র আলো ফেলে জঙ্গলের বুক চিরে এগিয়ে আসছিল। চাকার নিচে শুকনো পাতা আর কাঁকড় বিছানো লাল মোরামের রাস্তা মড়মড় করে ভাঙছে। গাড়ির ভেতরে পাঁচজন যাত্রী, আর পেছনের ডিকিতে একটা বড় ট্রাভেল ব্যাগ—যেটা একটু বেশিই ভারী।
ড্রাইভিং সিটে অর্ক। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। এসির টেম্পারেচার ১৮-তে করা, তাও তার গরম লাগছে। পাশের সিটে ঋক, হাতে একটা জনি ওয়াকার ব্ল্যাক লেবেলের বোতল। পেছনের সিটে সায়ন, বিপাশা আর তিয়াস। কারো মুখে কোনো কথা নেই। সাইলেন্সটা অস্বস্তিকর, কেবল ইঞ্জিনের গোঙানি আর বাইরের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক সেই নৈশব্দ্যকে আরও প্রকট করে তুলছে।
“আর কতটা?” বিপাশা ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল। তার গলার স্বরটা কাঁপছে। সে বারবার জানলা দিয়ে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকাচ্ছে। মনে হচ্ছে, ওই শাল গাছের আড়াল থেকে কেউ বা কারা তাদের লক্ষ্য করছে।
“ম্যাপ তো বলছে আর দু’কিলোমিটার,” অর্ক স্টিয়ারিংয়ে চাপড় মেরে বলল। “কিন্তু এই জিপিএস-টা পাগল হয়ে গেছে মনে হয়। রাস্তা তো শেষই হচ্ছে না।”
ঋক বোতলে একটা বড় চুমুক দিয়ে বলল, “চিন্তা করিস না। এই জায়গাটা পারফেক্ট। সিগন্যাল নেই, মানুষ নেই, পুলিশ নেই। জাস্ট আমরা আর… আমাদের কাজ।” সে পেছনের ডিকির দিকে একবার তাকাল। অর্থপূর্ণ চাউনি।
গাড়িটা একটা বাঁক নিতেই হেডলাইটের আলোয় ভেসে উঠল একটা বিশাল, জরাজীর্ণ গেট। লোহার গেটটা মরচে ধরে কঙ্কালসার হয়ে আছে, তার গায়ে জড়িয়ে আছে বুনো লতার জঙ্গল। গেটের ওপাশে একটা বিশাল চত্বর, আর তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একটা পুরোনো ব্রিটিশ আমলের ডাকবাংলো। বাড়িটার পলেস্তারা খসে গেছে, বেরিয়ে আছে পাঁজরের মতো ইটের কাঠামো। ছাদের কার্নিশে বড় বড় অশ্বত্থ গাছ শিকড় গেড়েছে, যেন বাড়িটাকে মাটির নিচ থেকে উঠে আসা কোনো আদিম প্রাণী জাপটে ধরে আছে।
কিন্তু যেটা সবচেয়ে বেশি ভয়ের, সেটা বাংলোর পেছনের জঙ্গলটা। সেখান থেকে একটা অদ্ভুত গন্ধ ভেসে আসছে। পচা ফুল, পোড়া মাংস আর উগ্র ধুনুচির গন্ধ মেশানো এক ভ্যাপসা বাতাস।
গাড়ি থামল। ওরা নামল। চারদিকটা এত নিস্তব্ধ যে নিজেদের জুতোর শব্দও কানে বাজছে।
“জায়গাটা বড্ড… ইভিল,” তিয়াস বলল। সে পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরাল, কিন্তু তার হাত কাঁপছে। “আমার মনে হচ্ছে আমাদের এখানে আসাটা ভুল হয়েছে।”
সায়ন হাসল। তার হাসিটা শুকনো, কর্কশ। “ভুল? ভুল তো সে করেছিল, যে আমাদের বোকা ভাবত। ওই হিজড়াটা ভেবেছিল ও একাই সব ক্রেডিট নেবে? ডায়াবেটিসের পার্মানেন্ট কিওর! ভাবা যায়? হাজার হাজার কোটি টাকার মার্কেট। আর ও চেয়েছিল ওটা চ্যারিটিতে দিয়ে দিতে! সমাজসেবা!”
বিপাশা বলল, “আস্তে কথা বল। দেয়ালেরও কান থাকে।”
“এখানে দেয়াল ছাড়া আর কিছু নেই রে,” অর্ক বলল। “চল, কাজটা সেরে ফেলি। তারপর পার্টি হবে।”
ওরা পেছনের ডিকিটা খুলল। ট্রাভেল ব্যাগের জিপটা একটু ফাঁক হয়ে আছে। সেখান দিয়ে বেরিয়ে আছে একটা হাত। ফর্সা, সুন্দর হাত, কিন্তু নখগুলো নীল হয়ে গেছে। হাতে একটা সোনার বালা, আর আঙুলে একটা বড় নীলম পাথরের আংটি।
Reviews
Clear filtersThere are no reviews yet.