নাগপুরের পাচপাওলি এলাকায় বর্ষার মেঘ ভারী হয়ে ঝুলে আছে। সন্ধ্যার আলো-আঁধারে গলির মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে উনিশ বছরের রাজা খান। তার হাতে একটা ছেঁড়া ছবি – বাবার সাথে তোলা শেষ ছবি। দুই বছর আগের কথা মনে পড়ে যায়। সেদিনও এমনই বর্ষার দিন ছিল।
রাজার বাবা নসির খান মারা গিয়েছিলেন মদের নেশায়। দিনের পর দিন মদ খেয়ে খেয়ে শরীরটা নষ্ট করে ফেলেছিলেন। রাজা চোখের সামনে দেখেছে কীভাবে একটা সুস্থ মানুষ একটু একটু করে মরে যায়। কীভাবে একজন ভালো বাবা হয়ে ওঠে অচেনা এক পরিচিত মুখ।
“ওরা তোমাকে মেরেছে, বাবা,” ছবিটা বুকের কাছে চেপে ধরে ফিসফিস করে বলে রাজা। “যারা বিষ বিক্রি করে বোতলে ভরে, ওরাই তোমার খুনি।”
সেদিন বাবার মৃত্যুর পর রাজা একটা প্রতিজ্ঞা করেছিল। সব মদের দোকান, সব বিয়ার বার – এসব জায়গা থেকে সে প্রতিশোধ নেবে। তার বাবার মতো আরও কত বাবা যে এসব জায়গার কারণে মারা যাচ্ছে, সেটা ভেবে তার রাগ আরও বেড়ে যায়।
কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেই প্রতিশোধের গল্পটা একটু ভিন্ন রূপ নেয়।
প্রথমদিকে রাজা সত্যিই বিশ্বাস করত যে সে একটা মহৎ কাজ করছে। সে নিজেকে বলত একজন যোদ্ধা, যে লড়াই করছে নেশার বিরুদ্ধে। কিন্তু বাস্তব হলো, বাবার মৃত্যুর শোকে সে নিজেই নেশার জগতে ঢুকে গিয়েছিল। প্রথমে সিগারেট, তারপর গাঁজা।
“এটা আলাদা,” মনে মনে নিজেকে বোঝাত রাজা। “গাঁজা তো মদ না।” সম্প্রতি ইউটিউব এ কয়েকটা ভিডিও দেখে সে নিশ্চিত যে সিগারেট বাবসায়ীদের কথা রাখার জন্যই গাঁজাকে লিগাল করে নি সরকার! সব চক্রান্ত!
প্রথম আক্রমণটা ঘটেছিল ছয় মাস আগে। শর্মার মদের দোকানে। সেদিন সন্ধ্যায় দোকানদার একজন গ্রাহকের সাথে হাসতে হাসতে বলছিল, “এই সব মাতালরা তো নিজেদের নিয়ন্ত্রণই করতে পারে না।” কথাটা শুনে রাজার মাথায় রক্ত উঠে গেল।
সেই রাতেই দোকানের জানালা ভেঙে দিয়েছিল রাজা। একটা চিরকুট রেখে এসেছিল: “এটা সেই সব বাবাদের জন্য যাদের তুমি মেরেছ। – রাজা অমরাবতী।”
নামটা হঠাৎই মনে এসেছিল। তার নিজের নাম রাজা আর বাবার জন্মের জেলা অমরাবতী – দুটো মিলিয়ে। একটা গুপ্ত পরিচয়ের মতো লাগছিল, যেন কোনো সুপারহিরোর নাম।
স্থানীয় খবরের কাগজে ছাপা হয়েছিল, “মদবিরোধী কর্মীদের ভাঙচুর।” এই লাইনটা পড়ে রাজার খুব গর্ব হয়েছিল। সে কেবল একজন ভাঙচুরকারী না, সে একজন কর্মী, একজন যোদ্ধা।
দ্বিতীয় আক্রমণ হয়েছিল তিন সপ্তাহ পরে। এবার একটা বিয়ার বারে। রাজা রাতের অন্ধকারে মুখ ঢেকে ঢুকে গিয়েছিল। ক্যাশ বক্স থেকে পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে পালিয়ে এসেছিল। টাকাটা নেওয়ার সময় সে নিজেকে বলেছিল, “এটা চুরি না, এটা ক্ষতিপূরণ। এই টাকা দিয়ে কত পরিবার নষ্ট হয়েছে।”
কিন্তু সেই টাকা দিয়ে সে কী করেছিল? গাঁজা কিনেছিল। ভালো মানের, দামি গাঁজা।
তৃতীয় আক্রমণের পর রাজা বুঝতে পারল যে এই কাজটা তার কেমন যেন ভালো লাগে। শুধু প্রতিশোধ নয়, এই রোমাঞ্চ, এই অ্যাড্রেনালিন রাশ – এসব তাকে নেশার মতোই পেয়ে বসেছে।
“রাজা অমরাবতী” এর নাম ছড়িয়ে পড়তে লাগল পাচপাওলি এলাকায়। মানুষজন কানে কানে বলাবলি করত। কেউ বলত, “ভালো করেছে, এই মদের দোকানগুলো বন্ধ হওয়া উচিত।” আবার কেউ বলত, “এ তো একটা সন্ত্রাসী।”
রাজা এসব শুনত আর নিজের মিশনের প্রতি আরও দৃঢ় হত। কিন্তু বাস্তবটা ছিল অন্য রকম।
চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ আক্রমণ – প্রতিটার পর রাজার গাঁজার খরচ বাড়তে থাকে। ভালো মানের গাঁজা, বেশি পরিমাণ। সে নিজেকে বলত, “বাবার মৃত্যুর ব্যথা সহ্য করতে গেলে এটা লাগেই।”
সপ্তম আক্রমণের সময় একটা ঘটনা ঘটল। দোকান মালিকের ছোট ছেলে সেখানে ছিল। আট-নয় বছরের একটা বাচ্চা। রাজা টাকা নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় ছেলেটা কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আঙ্কেল, আমার বাবা খারাপ কাজ করে না। উনি শুধু কাজ করেন।”
সেই কথাটা রাজার মনে বেঁধে গেল। রাতে ঘরে ফিরে গাঁজা টানতে টানতে সে ভাবল, বাচ্চাটার বাবাও তো কারোর বাবা। তারও হয়তো পরিবার আছে, খাওয়ানোর দায়িত্ব আছে।
কিন্তু পরদিন সকালে সেই চিন্তা উড়ে গেল। গাঁজার টাকা ফুরিয়ে গেছে, আবার চাই।
অষ্টম আক্রমণ, নবম আক্রমণ। প্রতিবার রাজা আরো বেশি টাকা চুরি করত, আরো বেশি গাঁজা কিনত। তার প্রতিশোধের গল্পটা হয়ে উঠেছিল নেশার ঢাকনা।
জুলাই মাসের ৩১ তারিখ। রাজার শেষ আক্রমণের দিন।
সেদিন সকালে উঠেই রাজার গাঁজার জন্য হাহাকার শুরু হয়ে গেছে। পকেটে একটা পয়সাও নেই। কাজেও যায়নি কয়েকদিন, কন্ট্রাক্টর রেগে গিয়ে কাজ থেকে বাদ দিয়ে দিয়েছে।
“আজকেই শেষ,” নিজেকে বলে রাজা। “আজ একটা বড় দোকানে মারব, অনেক টাকা নেব, তারপর আর করব না।”
সন্ধ্যার দিকে রাজা বেরিয়ে পড়ল। গায়ে একটা পুরনো জ্যাকেট, মুখে গামছা বেঁধে। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে ভাবছে, আজকের টার্গেট কোনটা।
পান্ডে সাহেবের মদের দোকান। বেশ বড়সড়, গ্রাহকও বেশি আসে। ক্যাশ বক্সে ভালো টাকা থাকার কথা।
রাত দশটায় নিঃশব্দে ঢুকে পড়ল রাজা। দোকানে কেবল পান্ডে সাহেব আছেন, অ্যাকাউন্টের খাতা নিয়ে বসে। রাজার হৃদয়ে ধুকপুক ধুকপুক শব্দ। হাতে একটা ভাঙা বোতল তুলে মুখ ভর্তি রাগ নিয়ে চিৎকার করল, “চুপচাপ সব টাকা বের কর! একটা আওয়াজ করলে জীবন শেষ!”
পান্ডে সাহেব আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে বলেন, “ভাই, আমার পরিবার আছে। প্লিজ কিছু করো না।”
“তোর পরিবার?” রাজার চোখে রক্ত। “আমার বাবার কথা ভেবেছিলি যখন বিষ বিক্রি করতি? তাড়াতাড়ি টাকা বের কর!”
পান্ডে সাহেব ভয় পেয়ে গিয়ে ক্যাশ বক্স খুলে দিলেন। ছত্রিশ হাজার টাকা। রাজার চোখ চকচক করে উঠল। এত টাকা! এই টাকায় অনেকদিনের গাঁজা হবে।
টাকা নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় রাজার নজরে পড়ল কাউন্টারের পাশে রাখা সিগারেটের প্যাকেট। পনেরোটা প্যাকেট। ভাবল, এগুলো বিক্রি করে আরো কিছু টাকা পাওয়া যাবে।
কিন্তু রাজা জানত না যে পান্ডে সাহেবের ছোট ভাই পাশের ঘরেই লুকিয়ে ছিল। সে সব দেখেছে। রাজা চলে যাওয়ার পর সে পুলিশে ফোন করল।
“একজন যুবক এসে আমাদের দোকানে হামলা করেছে! সে নিজেকে ‘রাজা অমরাবতী’ বলে পরিচয় দিয়েছে। ছত্রিশ হাজার টাকা আর সিগারেটের প্যাকেট নিয়ে গেছে। ও লম্বা, চিকন, গায়ে নীল জ্যাকেট আর মুখে গামছা বাঁধা।”
রাজা সেই রাতে বাড়ি ফিরে গাঁজা কিনতে গেল। টাকার বান্ডিল দেখে পেডলার অবাক হয়ে গেল।
“এত টাকা হাতে এল কোথা থেকে, বস?”
রাজার চোখে ভয়ানক দৃষ্টি। “যারা আমার বাবাকে হত্যা করেছে, তাদের কাছ থেকে আদায় করা।” কথাটা বলার সময় তার গলায় ছিল গর্ব আর সন্তুষ্টি।
পরদিন সকালে রাজা গাঁজা টেনে টেনে ঘুমাচ্ছিল। হঠাৎ দরজায় জোর আওয়াজ। পুলিশ।
“রাজা খান, দরজা খোল!”
রাজার ঘুম ভেঙে গেল। বুঝতে পারল, ধরা পড়ে গেছে। কিছুক্ষণ ভাবল পালানোর কথা, কিন্তু ঘরে তো কোনো পেছনের দরজা নেই।
ভোর পাঁচটায় রাজার ঘুম ভাঙল জোরে দরজা ভাঙার শব্দে। “রাজা খান! পুলিশ! দরজা খুলে দে এখনই!”
রাজার হার্টবিট বেড়ে গেল। ঘামে ভিজে গেল পুরো শরীর। পালানোর কোনো রাস্তা নেই। ভাঙা জানালা দিয়ে লাফ দেওয়ার চেষ্টা করতেই দরজা ভেঙে ঢুকে পড়ল পুলিশ।
ইন্সপেক্টর শর্মা সোজা চলে গেলেন রাজার বিছানার কাছে। মাদুরের নিচ থেকে বের করলেন টাকার বান্ডিল, গাঁজার প্যাকেট, আর সিগারেটের বাক্স।
“তাহলে তুই-ই সেই বিখ্যাত ‘রাজা অমরাবতী’?” ইন্সপেক্টর শর্মার কণ্ঠে তীব্র ব্যঙ্গ। “মদের দোকান লুট করিস আর গাঁজা কিনে নেশা করিস?”
রাজা ঘাবড়ে গিয়ে বলার চেষ্টা করল, “স্যার, আপনারা বুঝছেন না! আমি মদের বিপক্ষে যুদ্ধ করছি! আমার বাবা…” কথা শেষ করতে পারল না।
“তোর বাবা মরেছে মদ খেয়ে, আর তুই মরছিস গাঁজা খেয়ে!” অফিসার একটা প্যাকেট তুলে ধরে বললেন। “পার্থক্য কোথায় বল দেখি?”
রাজার মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরলো না। সত্যিটা কী বলবে? যে সে নিজেই একজন নেশাখোর? যে প্রতিশোধের নাম করে সে নিজের নেশার টাকা জোগাড় করত?
থানায় নিয়ে যাওয়ার সময় রাস্তার দুই পাশে ভিড় জমে গেছে। কেউ চিৎকার করে বলছে, “এই শয়তানটাকে ফাঁসি দাও!” আবার কেউ দুঃখ করে বলছে, “হায় হায়, বাবার মৃত্যুতে পাগল হয়ে গেছে ছেলেটা।”
কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল সেই নীরবতা যা রাজার ভেতরে বাজছিল। সে বুঝতে পারছিল, তার গৌরবের দিন শেষ। আজ থেকে সে আর যোদ্ধা না, সে একজন সাধারণ অপরাধী।
থানার লকআপে বসে রাজা ভাবতে লাগল। কী করেছে সে? বাবার প্রতিশোধ নিতে গিয়ে নিজেই হয়ে উঠেছে সেই মানুষ যার বিরুদ্ধে সে লড়াই করত। মদখোর বাবা, গাঁজাখোর ছেলে – পার্থক্য কোথায়?
“বাবা, তুমি আমাকে ক্ষমা করো,” চোখের জল ফেলে বলল রাজা। “তোমার নামে যা করেছি, সবই ভুল ছিল।”
ইন্সপেক্টর শর্মা কয়েক ঘণ্টা পর এসে রাজার সামনে একটা ফাইল ছুড়ে দিলেন। “দেখ, তোর সব অপরাধের তালিকা। নয়টা দোকানে ডাকাতি, দেড় লক্ষ টাকা চুরি। এতগুলো পরিবারের ক্ষতি করেছিস। সব টাকা গেল কোথায়?”
রাজা মাথা হাঁটুর উপর রেখে ফিসফিস করে বলল, “গাঁজায় পুড়ে গেছে স্যার। সব শেষ।”
“বাবার প্রতিশোধ নিতে গিয়ে তুই নিজেই তোর বাবার মতো নেশাখোর হয়েছিস। এর চেয়ে বড় ব্যর্থতা আর কী হতে পারে?”
রাজা কিছুই বলল না। কী বলবে? যে সে ভেবেছিল সে একজন যোদ্ধা, কিন্তু আসলে ছিল একজন চোর? যে সে মদের বিরুধিতা করে গাঁজার গোলাম হয়েছিল?
সেই রাতে লকআপে শুয়ে রাজা বাবার কথা ভাবল। নসির খান যখন মদ খেতেন, তখনও এরকমই নানা অজুহাত দিতেন। “কাজের চাপ সহ্য করার জন্য পান করি। এটা জরুরি।”
রাজাও তাই করেছে। প্রতিশোধের নাম করে নিজের নেশাকে জায়েজ করেছে।
পরদিন সকালে কোর্টে যাওয়ার পথে রাজা দেখল খবরের কাগজের হেডলাইন: “রাজা অমরাবতী: নেশার জালে আটকা পড়া এক প্রতিশোধপিপাসুর পতন।”
সেই হেডলাইন পড়তে পড়তে রাজার বুকটা ফেটে যেতে চাইল। এটাই তার পরিচয় হয়ে গেল। বাবার গৌরব ফিরিয়ে আনার স্বপ্নে সে নিজের সব মর্যাদা হারিয়ে ফেলেছে।
জজ সাহেব চশমার ওপর দিয়ে রাজার দিকে তাকিয়ে কঠোর কণ্ঠে বললেন, “রাজা খান, তুমি ভেবেছিলে তুমি একজন ন্যায়ের যোদ্ধা। কিন্তু আসলে তুমি হয়ে উঠেছিলে সেই অন্যায়কারী যার বিরুদ্ধে তুমি লড়াই করতে চেয়েছিলে। মদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে গাঁজার গোলাম হওয়া – এটাই তোমার বাবার প্রতি সবচেয়ে বড় অপমান।”
রাজা সেদিন বুঝেছিল, প্রতিশোধ কখনোই সমাধান নয়। সে যদি সত্যিই বাবার স্মৃতিকে সম্মান করতে চাইত, তাহলে নিজেকে সুস্থ রাখত, কাজ করত, ভালো মানুষ হওয়ার চেষ্টা করত।
কিন্তু এখন আর খুব দেরি হয়ে গেছে। “রাজা অমরাবতী” নামটা ইতিহাসে থেকে যাবে একজন ভণ্ড যোদ্ধার পরিচয় হিসেবে। আর রাজা খান? সে এখন জেলের অন্ধকার কোঠায়, নিজের ভুলের সাথে মুখোমুখি।
তবে হয়তো এখনও সব শেষ হয়ে যায়নি। জেল থেকে বেরিয়ে সে হয়তো সত্যিকারের একটা নতুন জীবন শুরু করতে পারবে। বাবার স্মৃতিকে সম্মান করার প্রকৃত পথ খুঁজে পাবে।
সেটা হবে রাজা খান হয়ে, রাজা অমরাবতী হয়ে নয়।
এই গল্পটি একটি সত্য ঘটনার উপর ভিত্তি করে লেখা। নাগপুরের পাচপাওলি থানার পুলিশ ২০২৪ সালের জুলাই মাসে রাজা খান নামের এই যুবককে গ্রেফতার করে। তার গল্প আমাদের শেখায় যে প্রতিশোধ কখনোই সমাধান নয়, আর নেশা যে নামেরই হোক না কেন, তা সর্বদা ধ্বংসাত্মক।