কলকাতার সেপ্টেম্বরের সকাল। হুগলী নদীর ওপর দিয়ে ভেসে আসা কুয়াশা শহরের পুরোনো দালানগুলোকে ঢেকে রেখেছে। দেবব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় তার পার্ক স্ট্রিটের ছোট্ট অফিসে বসে চা খাচ্ছিলেন। প্রাইভেট ডিটেক্টিভ হিসেবে পনেরো বছরের অভিজ্ঞতা তাঁর। কলকাতা পুলিশ থেকে অবসর নেওয়ার পর এই কাজ শুরু করেছেন।
দরজায় নক। সুমিত্রা চট্টোপাধ্যায় ভেতরে ঢুকলেন। চল্লিশের কোঠায়, সুন্দরী মহিলা। কিন্তু চোখে উদ্বেগের ছায়া।
“আমি সুমিত্রা চট্টোপাধ্যায়। আমার মেয়ে তন্বীর খোঁজ করতে হবে।”
দেবব্রত চশমাটা সোজা করে নিলেন। “বসুন। কী হয়েছে?”
“তন্বী তিন দিন আগে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল। বলেছিল বন্ধুর সাথে দেখা করতে যাচ্ছে। কিন্তু সে আর ফিরে আসেনি।”
“পুলিশে খবর দিয়েছেন?”
“দিয়েছি। কিন্তু তারা বলছে চব্বিশ ঘন্টা হয়নি তখন। এখন তিন দিন হয়ে গেছে, তবুও তেমন কিছু করছে না। বলছে মেয়েরা এভাবেই কখনো কখনো পালিয়ে যায়।”
দেবব্রত মাথা নাড়লেন। “তন্বীর বয়স কত?”
“উনিশ। কলেজে পড়ে। ওর বাবা দশ বছর আগে মারা গিয়েছেন। আমি একা ওকে মানুষ করেছি।”
সুমিত্রার চোখে জল এসে গেল। দেবব্রত টিস্যু এগিয়ে দিলেন।
“আপনার মেয়ের কোনো প্রেমের সম্পর্ক ছিল?”
“ছিল। অর্জুন মিত্র নামে একটা ছেলের সাথে। কিন্তু দুই মাস আগে তাদের সম্পর্ক ভেঙে গিয়েছে।”
“কেন?”
“অর্জুন নাকি অন্য মেয়ের সাথে সম্পর্ক করছিল। তন্বী খুব কষ্ট পেয়েছিল।”
দেবব্রত নোটবুকে কিছু লিখলেন। “যে বন্ধুর সাথে দেখা করতে গিয়েছিল, তার নাম কী?”
“প্রিয়াঙ্কা দাস। ওরা স্কুল জীবন থেকে বন্ধু।”
“প্রিয়াঙ্কার সাথে কথা বলেছেন?”
“বলেছি। সে বলছে তন্বী তার কাছে যায়নি। আর তার সাথে কোনো দেখা করার কথাও হয়নি।”
দেবব্রত ভুরু কুঁচকালেন। “তাহলে তন্বী মিথ্যা বলে বেরিয়েছে?”
“মনে হচ্ছে তাই।”
“আচ্ছা, আমি এই কেসটা নেব। আমার ফি দিনে দুই হাজার টাকা। প্লাস খরচাপাতি।”
সুমিত্রা পার্স থেকে টাকা বের করে টেবিলে রাখলেন। “এক সপ্তাহের অগ্রিম। দয়া করে আমার মেয়েকে খুঁজে দিন।”
***
পরদিন সকালে দেবব্রত তন্বীর কলেজে গেলেন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী।
প্রফেসর শুভ্র সেনগুপ্ত তন্বীর ক্লাস টিচার। তিনি দেবব্রতকে বললেন, “তন্বী খুব ভালো মেয়ে। পড়াশোনায় মন দেয়। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহ ধরে একটু অন্যমনস্ক লাগছিল।”
“কোনো সমস্যার কথা বলেছিল?”
“না, তেমন কিছু বলেনি। তবে অর্জুনর সাথে ব্রেকআপের পর থেকে একটু চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল।”
দেবব্রত কলেজের ক্যান্টিনে গিয়ে তন্বীর বন্ধুদের সাথে কথা বললেন। প্রিয়াঙ্কা দাস সেখানেই পেলেন।
“প্রিয়াঙ্কা, আমি দেবব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রাইভেট ডিটেক্টিভ। তন্বীর মা আমাকে তাকে খুঁজে বের করার জন্য দিয়েছেন।”
প্রিয়াঙ্কা একটু ঘাবড়ে গেল। “আমি তো সুমিত্রা আন্টিকে বলেছি, তন্বী আমার কাছে আসেনি।”
“হ্যাঁ, সেটা জানি। কিন্তু তন্বী গত কয়েক দিন কেমন ছিল?”
“একটু অদ্ভুত। মানে, সে বলছিল যে কেউ একজন তাকে ফোলো করছে। আমি ভেবেছিলাম অর্জুনর কথা বলছে।”
“কেউ তাকে ফোলো করছিল?”
“সে তাই বলেছিল। কিন্তু আমি কাউকে তো দেখিনি।”
দেবব্রত আরো খোঁজখবর নিলেন। তন্বীর রুমমেট রিয়া বোস জানাল যে তন্বী গত কয়েক রাতে ভালো ঘুমাতে পারছিল না।
“ও বলেছিল যে কেউ রাতে তার জানালার নিচে দাঁড়িয়ে থাকে। আমি বলেছিলাম পুলিশে খবর দিতে। কিন্তু ও বলল, ‘না, এখনো না।'”
“কেন এখনো না?”
“সেটা বলেনি। কিন্তু মনে হচ্ছিল ও কিছু একটা লুকিয়ে রাখছে।”
***
বিকেলে দেবব্রত অর্জুন মিত্রর খোঁজ করলেন। সে থাকে গড়িয়াহাটে। ছেলেটি বাড়িতেই ছিল।
“আমি দেবব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। তন্বীর ব্যাপারে আপনার সাথে কথা বলতে এসেছি।”
অর্জুন বিরক্ত মুখ করল। “তন্বী কী করেছে এখন? আমাদের তো সম্পর্ক শেষ।”
“সে হারিয়ে গিয়েছে। তিন দিন ধরে ওর কোনো খোঁজ নেই।”
অর্জুনর মুখ পাল্টে গেল। “কী বলছেন? হারিয়ে গিয়েছে মানে?”
“বাড়ি থেকে বেরিয়ে আর ফেরেনি।”
অর্জুন চেয়ারে বসে পড়ল। “এটা হতে পারে না। তন্বী এমন মেয়ে না।”
“আপনাদের সম্পর্ক কেন ভেঙে গিয়েছিল?”
অর্জুন মাথা নিচু করল। “আমার ভুল হয়েছিল। সুহানা নামে একটা মেয়ের সাথে… মানে, আমি তন্বীকে ধোকা দিয়েছিলাম।”
“তন্বী জানতে পেরেছিল?”
“হ্যাঁ। ও খুব কষ্ট পেয়েছিল। কিন্তু আমি বোঝাতে চেয়েছিলাম যে সেটা ভুল হয়েছিল। আমি তন্বীকেই ভালোবাসি।”
“ও শুনতে চায়নি?”
“না। ও বলেছিল যে বিশ্বাস ভেঙে গেলে আর জোড়া লাগে না।”
দেবব্রত অর্জুনকে পর্যবেক্ষণ করলেন। ছেলেটি সত্যি কথা বলছে বলে মনে হচ্ছে।
“গত কয়েক দিনে তন্বীর সাথে কোনো যোগাযোগ হয়েছে?”
“না। আমি কয়েকবার ফোন করেছিলাম, কিন্তু ও রিসিভ করেনি। শেষে আমি চেষ্টা করা বন্ধ করেছি।”
“আপনি কি জানেন তন্বী মনে করছিল কেউ তাকে ফোলো করছে?”
অর্জুনর চোখ বড় হয়ে গেল। “না! এটা কী বলছেন?”
“তার বন্ধুরা বলেছে।”
“কিন্তু কে? কেন?”
দেবব্রত বুঝতে পারলেন অর্জুন এ ব্যাপারে কিছু জানে না।
***
সন্ধ্যায় দেবব্রত তাঁর অফিসে ফিরে তন্বীর মোবাইল নম্বর ট্রেস করার চেষ্টা করলেন। তাঁর এক পুরোনো সহকর্মী সুব্রত দত্ত এখন সাইবার ক্রাইম বিভাগে কাজ করে।
“সুব্রত, একটা হেল্প লাগবে।”
“বল দেবু দা।”
“একটা মেয়ে হারিয়ে গিয়েছে। ওর ফোন ট্রেস করতে পারবি?”
“নম্বরটা দে।”
দেবব্রত নম্বরটা দিলেন। একটু পরে সুব্রত ফোন করল।
“দেবু দা, ফোনটা শেষবার অন ছিল তিন দিন আগে। লোকেশন দেখাচ্ছে কাশী মিত্রের ঘাট এলাকা। তারপর থেকে সুইচ অফ।”
কাশী মিত্রের ঘাট। হুগলী নদীর পাড়ে একটা পুরোনো এলাকা। দেবব্রত ভাবলেন, তন্বী সেখানে কী করতে গিয়েছিল?
পরদিন সকালে দেবব্রত কাশী মিত্রের ঘাটে পৌঁছালেন। এটা একটা পুরোনো, অবহেলিত এলাকা। নদীর ধারে ভাঙা বাড়িঘর, জেলেদের আড্ডা।
স্থানীয় চা-দোকানে জিজ্ঞাসা করলেন। হরি কাকা নামে চা-দোকানি বললেন, “হ্যাঁ, তিন দিন আগে একটা মেয়ে এসেছিল। সুন্দরী মেয়ে। জিজ্ঞাসা করছিল গৌতম বাবুর বাড়ি কোথায়।”
“গৌতম বাবু কে?”
“উনি এখানকার একটা পুরোনো বাড়িতে থাকেন। খুব কম লোকে চেনে। কিছু অদ্ভুত কাজকর্ম করেন নাকি।”
“কী রকম অদ্ভুত?”
“জানি না। কিন্তু রাতে অনেকে তার বাড়িতে যায়। আর সবাই টাকাওয়ালা লোক।”
দেবব্রত গৌতম বাবুর বাড়ির খোঁজ নিলেন। এটা নদীর পাড়ে একটা তিনতলা পুরোনো বাড়ি। বাইরে থেকে দেখে মনে হয় পরিত্যক্ত।
দরজায় নক করলেন। কেউ দরজা খুলল না। কিন্তু দেবব্রত বুঝতে পারলেন ভেতরে কেউ আছে।
***
দেবব্রত বাড়িটার চারপাশে ঘুরে দেখলেন। পেছনে একটা ছোট গেট আছে, যেটা নদীর দিকে খোলে। সন্ধ্যার পর ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিলেন।
রাত আটটার সময় তিনি আবার গেলেন। এবার বাড়িতে আলো জ্বলছে। কয়েকটা দামি গাড়ি বাড়ির সামনে দাঁড়ানো।
দেবব্রত একটা গাছের আড়ালে লুকিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন। রাত নটার দিকে কয়েকজন লোক বেরিয়ে এল। সবাই স্যুট-টাই পরা, দেখে মনে হচ্ছে ভদ্রলোক।
একজনকে চিনতে পারলেন। রবীন্দ্র নাথ রায়, একজন বড় ব্যবসায়ী। তার ছবি পত্রিকায় দেখেছেন।
লোকগুলো চলে যাওয়ার পর দেবব্রত বাড়ির কাছে গেলেন। পেছনের গেট দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করলেন। গেটটা খোলা ছিল।
বাড়ির ভেতরটা অন্ধকার। টর্চ জ্বালিয়ে এগোতে লাগলেন। নিচতলায় কিছু পুরোনো আসবাবপত্র। কিন্তু দোতলায় উঠে অবাক হয়ে গেলেন।
পুরো দোতলাটা একটা বিলাসবহুল অফিসের মতো সাজানো। দামি কার্পেট, সোফা, এবং একটা বড় টেবিল।
টেবিলের ওপর কিছু কাগজপত্র পড়ে আছে। দেবব্রত দেখলেন এগুলো কোনো ধরনের ছবি আর তথ্যের তালিকা। আর একটা নাম দেখে চমকে গেলেন: তন্বী চট্টোপাধ্যায়।
তার ছবি, তার ঠিকানা, কলেজের তথ্য – সব কিছু লেখা আছে। আরো কিছু মেয়ের নামও আছে।
হঠাৎ পেছন থেকে একটা আওয়াজ এল। “কে সেখানে?”
দেবব্রত ঘুরে দেখলেন একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। পঞ্চাশের কোঠায়, চোখে সোনার ফ্রেমের চশমা।
“আমি গৌতম সান্যাল। এই বাড়ির মালিক। আপনি এখানে কী করছেন?”
দেবব্রত মনে মনে প্রস্তুত হয়ে নিলেন। “আমি দেবব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রাইভেট ডিটেক্টিভ। তন্বী চট্টোপাধ্যায় নামে একটা মেয়ের খোঁজ করছি।”
গৌতমর মুখে একটা অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল। “আহ, তন্বী। হ্যাঁ, সে আমার কাছে এসেছিল।”
“কোথায় সে এখন?”
“বসুন। আমি আপনাকে সব বলছি।”
গৌতম দেবব্রতকে একটা চেয়ারে বসতে ইশারা করলেন।
***
“তন্বী তিন দিন আগে আমার কাছে এসেছিল,” গৌতম বলতে শুরু করলেন। “ও জানতে পেরেছিল আমাদের ব্যবসার কথা।”
“কী ব্যবসা?”
“আমরা একটা বিশেষ ধরনের সেবা দিই। ধনী মানুষদের জন্য।”
দেবব্রত বুঝতে পারলেন এটা সুবিধার কিছু নয়। “কী ধরনের সেবা?”
“তরুণী মেয়েদের সাথে বিশেষ সময় কাটানোর সুবিধা। একটা এক্সক্লুসিভ ক্লাব বলতে পারেন।”
দেবব্রতর মাথায় রক্ত উঠে গেল। “মানে একটা পতিতালয়?”
“না না, এত সাধারণ নয়। আমাদের ক্লায়েন্টরা কলকাতার সবচেয়ে ধনী এবং প্রভাবশালী লোক। আর মেয়েরাও স্বেচ্ছায় আসে। ভালো টাকা পায়।”
“তন্বী স্বেচ্ছায় এসেছিল?”
গৌতম হাসলেন। “না, ও এসেছিল আমাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহ করতে। ও একটা স্টিং অপারেশন করছিল।”
“কী?”
“তন্বী একটা সংবাদপত্রের জন্য কাজ করছিল। আমাদের এই ব্যবসার খবর পেয়ে ও প্রমাণ সংগ্রহ করতে এসেছিল।”
দেবব্রত অবাক হয়ে গেলেন। তন্বী সাংবাদিকতা করছিল? সুমিত্রা তো বলেনি।
“ও কোথায় এখন?”
গৌতমর মুখটা শক্ত হয়ে গেল। “ও আমাদের খুব সমস্যায় ফেলেছে। আমাদের ক্লায়েন্টদের তালিকা, ফটো, ভিডিও – সব সংগ্রহ করেছে।”
“কোথায় সে?”
“আমি জানি না। তিন দিন আগে ও এখান থেকে পালিয়েছে। আমাদের সব প্রমাণ নিয়ে।”
দেবব্রত বুঝতে পারলেন গৌতম মিথ্যা বলছে। “আপনি মিথ্যা বলছেন।”
গৌতম একটা বেল টিপলেন। সঙ্গে সঙ্গে দুইজন বড়সড় লোক এসে দেবব্রতকে ঘিরে ধরল।
“বন্দ্যোপাধ্যায় বাবু, আপনি অনেক কিছু জেনে ফেলেছেন। এখন আপনাকে আমাদের সাথে সহযোগিতা করতে হবে।”
“না হলে?”
“না হলে তন্বীর মতো আপনিও হারিয়ে যাবেন।”
***
দেবব্রত বুঝতে পারলেন তিনি বিপদে পড়েছেন। কিন্তু তাঁর পুলিশি অভিজ্ঞতা কাজে এল।
“আমি যদি এখান থেকে না ফিরি, আমার সহকর্মীরা এখানে এসে হাজির হবে। আমি তাদের এই ঠিকানা দিয়ে রেখেছি।”
গৌতম একটু ভাবলেন। “তাহলে আমরা আপনাকে ছেড়ে দেব। কিন্তু শর্ত হল, আপনি এই ব্যাপারে কাউকে কিছু বলবেন না।”
“আর তন্বী?”
“তন্বী নিজেই আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছে। আমরা তাকে কিছু করিনি।”
দেবব্রত বুঝতে পারলেন গৌতম এখনও মিথ্যা বলছে। কিন্তু এই মুহূর্তে পালানোটাই বুদ্ধিমানের কাজ।
“ঠিক আছে। আমি চলে যাচ্ছি।”
দুই লোক তাঁকে বাড়ির বাইরে পর্যন্ত এগিয়ে দিল। দেবব্রত বুঝতে পারলেন তারা তাঁকে নজরে রাখবে।
তিনি সোজা তাঁর অফিসে চলে গেলেন। কিন্তু পুরো পথে মনে হচ্ছিল কেউ তাঁকে ফোলো করছে।
অফিসে পৌঁছে তিনি সঙ্গে সঙ্গে সুব্রতকে ফোন করলেন।
“সুব্রত, জরুরি একটা কাজ আছে।”
“বল দেবু দা।”
“কাশী মিত্রের ঘাটে গৌতম সান্যাল নামে একজনের বাড়ি আছে। ওখানে একটা সেক্স র্যাকেট চলছে। আমাদের রেইড করতে হবে।”
“তুমি নিশ্চিত?”
“হ্যাঁ। আর তন্বী চট্টোপাধ্যায় নামে একটা মেয়ে হারিয়ে গিয়েছে। ওরা ওকে কিডন্যাপ করেছে।”
“ঠিক আছে। কাল সকালে রেইড হবে। কিন্তু দেবু দা, তুমি সাবধানে থেকো। এই ধরনের র্যাকেটের সাথে অনেক বড় বড় লোক জড়িত থাকে।”
রাতে দেবব্রত ঘুমাতে পারলেন না। তন্বী কোথায়? সে কি বেঁচে আছে? আর সুমিত্রা কেন বলেননি যে তন্বী সাংবাদিকতা করছে?
***
পরদিন সকালে দেবব্রত সুমিত্রার বাড়িতে গেলেন। তিনি জানতে চাইলেন তন্বীর সাংবাদিকতার ব্যাপারে।
সুমিত্রা প্রথমে অস্বীকার করলেন। কিন্তু দেবব্রত যখন গৌতমর কথা বললেন, তখন তিনি ভেঙে পড়লেন।
“হ্যাঁ, তন্বী ‘দৈনিক প্রতিবেদন’ পত্রিকার জন্য কাজ করছিল। ফ্রিল্যান্স রিপোর্টার হিসেবে।”
“কেন আমাকে বলেননি?”
“আমি জানতাম না এটা এত বিপজ্জনক। তন্বী বলেছিল ও একটা সামাজিক সমস্যা নিয়ে রিপোর্ট করছে।”
“কোন সামাজিক সমস্যা?”
“মেয়েদের পাচার। ও জানতে পেরেছিল যে কলকাতায় একটা বড় চক্র কাজ করছে। উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়েদের টার্গেট করে।”
দেবব্রত এবার বুঝতে পারলেন পুরো ব্যাপারটা। তন্বী একটা বড় চক্রের সন্ধান পেয়েছে এবং সেই জন্য তার জীবন বিপন্ন।
“তন্বী কি কোনো প্রমাণ সংগ্রহ করেছিল?”
“হ্যাঁ, ও একটা পেনড্রাইভে সব রেকর্ড করে রেখেছিল। ও বলেছিল এটা প্রকাশ হলে কলকাতায় হইচই পড়ে যাবে।”
“সেই পেনড্রাইভ কোথায়?”
“আমি জানি না। তন্বী বলেছিল ও নিরাপদ জায়গায় রেখেছে।”
হঠাৎ দেবব্রতর ফোন বেজে উঠল। সুব্রত।
“দেবু দা, খারাপ খবর। আমরা যখন রেইড করতে গেলাম, বাড়িটা খালি পেলাম। সব প্রমাণ নষ্ট করে দিয়ে পালিয়ে গিয়েছে।”
দেবব্রতর মন খারাপ হয়ে গেল। তিনি বুঝতে পারলেন গৌতমরা তাঁর কথা বিশ্বাস করেনি। তারা জানত যে পুলিশ আসবে।
***
দেবব্রত ‘দৈনিক প্রতিবেদন’ পত্রিকার অফিসে গেলেন। সম্পাদক শ্যামল দাসর সাথে দেখা করলেন।
“তন্বী চট্টোপাধ্যায় আমাদের জন্য একটা বিশেষ প্রতিবেদন লিখছিল,” শ্যামল দাস জানালেন। “মেয়েদের পাচার নিয়ে। খুবই সংবেদনশীল বিষয়।”
“ও কোনো প্রমাণ দিয়েছিল?”
“হ্যাঁ, কিছু ছবি আর নাম দিয়েছিল। কিন্তু ও বলেছিল আরো বড় প্রমাণ আছে। সেটা নিয়ে আসার পর আমরা প্রতিবেদনটা ছাপব।”
“সেই বড় প্রমাণ কী?”
“কিছু ভিডিও রেকর্ডিং। আর জড়িত ব্যক্তিদের একটা তালিকা। তন্বী বলেছিল এই তালিকায় কিছু খুবই প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম আছে।”
দেবব্রত জানতে চাইলেন তন্বী শেষ কবে অফিসে এসেছিল।
“চার দিন আগে। ও বলেছিল পরদিন চূড়ান্ত প্রমাণ নিয়ে আসবে। কিন্তু আর এলো না।”
দেবব্রত বুঝতে পারলেন তন্বী সেদিনই হারিয়ে গিয়েছে যেদিন সে চূড়ান্ত প্রমাণ সংগ্রহ করতে গিয়েছিল।
“তন্বী কোথা থেকে এই তথ্য পেয়েছিল?”
“ও বলেছিল একটা সূত্রের কাছ থেকে। কিন্তু নাম বলেনি।”
***
দেবব্রত ভাবতে লাগলেন তন্বীর সূত্র কে হতে পারে। হঠাৎ মনে পড়ল প্রিয়াঙ্কা বলেছিল তন্বী মনে করছিল কেউ তাকে ফোলো করছে।
তিনি আবার প্রিয়াঙ্কার সাথে দেখা করলেন।
“প্রিয়াঙ্কা, তন্বী কি কখনো বলেছিল সে কোনো বিপজ্জনক কাজ করছে?”
“না, তেমন কিছু বলেনি। কিন্তু গত মাসে ও একবার বলেছিল যে ও একটা বড় গল্প পেয়েছে। সেটা প্রকাশ হলে অনেক বড় বড় লোক মুশকিলে পড়বে।”
“আর কিছু?”
“হ্যাঁ, ও বলেছিল যে একটা মেয়ে ওর সাথে যোগাযোগ করেছে। সেই মেয়ে নাকি এই চক্রের ভুক্তভোগী।”
এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। দেবব্রত জানতে চাইলেন সেই মেয়ের কোনো পরিচয় আছে কিনা।
“তন্বী একটা নাম বলেছিল। শ্রেয়া সিং। কিন্তু আমি জানি না ও কোথায় থাকে।”
দেবব্রত শ্রেয়া সিংর খোঁজ করতে লাগলেন। কলকাতায় এই নামে অনেক মেয়ে আছে। কিন্তু তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় খোঁজ করে একজন শ্রেয়া সিংকে খুঁজে পেলেন যার প্রোফাইলে লেখা ছিল “সারভাইভার”।
তিনি শ্রেয়াকে একটা ম্যাসেজ পাঠালেন। কিছুক্ষণ পর জবাব এল।
“আপনি কে? কী চান?”
দেবব্রত লিখলেন, “আমি তন্বী চট্টোপাধ্যায়র খোঁজ করছি। আপনি কি তার সাথে যোগাযোগ করেছিলেন?”
একটু পর জবাব এল: “আমার সাথে দেখা করুন। পার্ক স্ট্রিটের কফি হাউসে। সন্ধ্যা ছয়টায়।”
***
সন্ধ্যায় দেবব্রত কফি হাউসে গেলেন। শ্রেয়া সিং একটা কোণার টেবিলে বসে অপেক্ষা করছিল। বাইশ-তেইশ বছর বয়স, কিন্তু চোখে অনেক কষ্টের ছাপ।
“আপনি দেবব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়?”
“হ্যাঁ। আমি তন্বীর খোঁজ করছি।”
শ্রেয়া চারপাশে তাকিয়ে নিল। “এখানে কথা বলা নিরাপদ নয়। আমার সাথে আসুন।”
তারা কফি হাউস ছেড়ে একটা ফাঁকা পার্কে গেল।
“তন্বী আমার সাথে দুই মাস আগে যোগাযোগ করেছিল,” শ্রেয়া বলতে শুরু করল। “আমি তাকে সব বলেছিলাম।”
“কী বলেছিলেন?”
“আমি গৌতম সান্যালর চক্রের ভুক্তভোগী। তারা আমাকে ধোকা দিয়ে ওই কাজে জড়িয়ে ফেলেছিল।”
শ্রেয়া তার গল্প বলতে লাগল। সে আগে একটা মডেলিং এজেন্সিতে কাজ করত। গৌতম তার কাছে এসে বলেছিল যে সে একটা বিশেষ ইভেন্টের জন্য হোস্টেস হিসেবে কাজ করতে পারে। ভালো টাকা পাবে।
“কিন্তু সেই ইভেন্টে গিয়ে দেখি এটা কোনো সাধারণ পার্টি নয়। সেখানে ধনী লোকেরা আসে মেয়েদের সাথে… আপনি বুঝতে পারছেন।”
“আপনি পালাতে চেষ্টা করেছিলেন?”
“করেছিলাম। কিন্তু তারা আমার কিছু কমপ্রোমাইজিং ছবি তুলে রেখেছিল। হুমকি দিয়েছিল যে পালালে এই ছবি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেবে।”
“তাহলে আপনি কীভাবে বেরিয়ে এলেন?”
“একদিন একটা রেইডের সময় পালিয়ে যাই। কিন্তু তারপর থেকেই তারা আমাকে খুঁজছে।”
দেবব্রত বুঝতে পারলেন শ্রেয়া কেন এত সাবধান থাকছে।
“তন্বীকে আপনি কী বলেছিলেন?”
“সব। গৌতমর নাম, তার চক্রের সদস্যদের নাম, কোথায় তারা এই কাজ করে – সব।”
“কোনো প্রমাণ দিয়েছিলেন?”
“হ্যাঁ। আমার কাছে কিছু ভিডিও ছিল। গোপনে রেকর্ড করেছিলাম। তন্বীকে একটা কপি দিয়েছিলাম।”
“আর তন্বী কী বলেছিল?”
“ও বলেছিল যে ও এই গল্প পত্রিকায় প্রকাশ করবে। আর আরো প্রমাণ সংগ্রহ করবে।”
“আপনার কি মনে হয় তন্বী কোথায় যেতে পারে?”
শ্রেয়া একটু ভাবল। “তন্বী আমাকে বলেছিল যে ও গৌতমর অন্য একটা জায়গার খোঁজ পেয়েছে। একটা ফার্মহাউস। সেখানে তারা VIP ক্লায়েন্টদের নিয়ে যায়।”
“সেই ফার্মহাউস কোথায়?”
“আমি জানি না। কিন্তু তন্বী বলেছিল ওটা শহরের বাইরে।”
***
দেবব্রত বুঝতে পারলেন তন্বী সম্ভবত সেই ফার্মহাউসেই গিয়েছিল এবং সেখানেই আটকা পড়েছে।
তিনি আবার সুব্রতর সাহায্য নিলেন। গৌতম সান্যালর নামে কোনো সম্পত্তি আছে কিনা খোঁজ করতে বললেন।
“দেবু দা, গৌতম সান্যালর নামে সোনারপুরে একটা ফার্মহাউস আছে। ২০ বিঘা জমি।”
“ঠিকানা দিতে পারবি?”
“হ্যাঁ, পাঠিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু দেবু দা, একা যেও না। এবার আমি সাথে যাব।”
“না সুব্রত, আমি আগে গিয়ে দেখি। যদি তন্বী সেখানে থাকে, তাহলে হঠাৎ পুলিশি রেইড হলে ওর ক্ষতি হতে পারে।”
পরদিন সকালে দেবব্রত সোনারপুরের দিকে রওনা দিলেন। ফার্মহাউসটা শহর থেকে প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার দূরে।
ফার্মহাউসটা বেশ বড়। চারপাশে উঁচু দেয়াল। বাইরে থেকে ভেতরে কী হচ্ছে দেখা যায় না।
দেবব্রত কাছাকাছি একটা ঢাবার দোকানে গিয়ে খোঁজখবর নিলেন।
“ওই ফার্মহাউসে কী হয়?” তিনি দোকানিকে জিজ্ঞাসা করলেন।
“জানি না ভাই। কিন্তু রাতের বেলা অনেক গাড়ি আসা-যাওয়া করে। আর মাঝে মাঝে মেয়েদের চিৎকারের আওয়াজ পাই।”
“মেয়েদের চিৎকার?”
“হ্যাঁ। আমরা ভেবেছি হয়তো কোনো পার্টি হয়। কিন্তু চিৎকারটা যেন কষ্টের মতো লাগে।”
দেবব্রতর মন খারাপ হয়ে গেল। তন্বী যদি সেখানে থাকে, তাহলে তার অবস্থা ভালো নয়।
সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করে তিনি ফার্মহাউসের কাছে গেলেন। দেয়ালে একটা ছোট ফুটো দিয়ে ভেতরে উঁকি মারলেন।
ভেতরে একটা বড় বাড়ি। সামনে একটা সুইমিং পুল। আর পুলের পাশে কয়েকটা মেয়ে বসে আছে। দূর থেকে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না, কিন্তু তাদের মধ্যে একজনকে তন্বীর মতো লাগছে।
***
দেবব্রত বুঝতে পারলেন তাঁকে ভেতরে ঢুকতে হবে। কিন্তু সামনের গেট দিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। পেছনের দিকে গিয়ে দেখলেন একটা ছোট গেট আছে।
রাত দশটার দিকে তিনি সেই গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকলেন। বাগানে লুকিয়ে লুকিয়ে বাড়ির কাছে পৌঁছালেন।
জানালা দিয়ে ভেতরে তাকিয়ে দেখলেন একটা বড় হলরুম। সেখানে কয়েকজন লোক বসে আছে। তাদের মধ্যে গৌতম সান্যালকেও দেখা যাচ্ছে।
আর পাশের ঘরে কয়েকটা মেয়ে বসে আছে। তাদের মধ্যে একজনকে দেখে দেবব্রতর বুক কেঁপে উঠল। তন্বী।
তিনি বুঝতে পারলেন তন্বী বন্দী অবস্থায় আছে। তার হাতে দড়ি দিয়ে বাঁধা।
দেবব্রত সঙ্গে সঙ্গে সুব্রতকে ফোন করলেন।
“সুব্রত, জরুরি। তন্বীকে পেয়েছি। সোনারপুরের ফার্মহাউসে। এখনি ফোর্স নিয়ে আসো।”
“ঠিক আছে দেবু দা। ২০ মিনিটে পৌঁছে যাচ্ছি।”
কিন্তু ২০ মিনিট অনেক সময়। দেবব্রত দেখলেন গৌতম তন্বীর কাছে যাচ্ছে। আর তার হাতে একটা সিরিঞ্জ।
দেবব্রত আর অপেক্ষা করতে পারলেন না। তিনি জানালা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়লেন।
***
“গৌতম, থামো!”
গৌতম চমকে ঘুরল। “আপনি এখানে কী করছেন?”
“তন্বীকে ছেড়ে দিন।”
গৌতমর লোকেরা দেবব্রতকে ঘিরে ধরল। কিন্তু দেবব্রত তাঁর পুলিশি ট্রেনিং কাজে লাগিয়ে তাদের সাথে লড়তে লাগলেন।
“তন্বী, তুমি ঠিক আছো?”
তন্বী দুর্বল গলায় বলল, “দেবব্রত কাকা, আমি ঠিক আছি। কিন্তু ওরা আমাকে মারার জন্য কিছু একটা দিতে চাইছে।”
গৌতম রেগে গিয়ে বলল, “এই মেয়ে আমাদের সর্বনাশ করে দিয়েছে। ওর কাছে আমাদের সব প্রমাণ আছে। ওকে শেষ করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।”
“পুলিশ আসছে। আপনার পালানোর সময় এসেছে।”
কিন্তু গৌতম হাসল। “পুলিশ এলেও কিছু হবে না। আমাদের অনেক বড় বড় লোক পিছনে আছে।”
ঠিক সেই সময় বাইরে পুলিশের সাইরেনের আওয়াজ শোনা গেল।
গৌতম একটু ঘাবড়ে গেল। “কিন্তু এত তাড়াতাড়ি?”
পুলিশ বাড়ি ঘিরে ফেলল। সুব্রত মেগাফোনে বলল, “আত্মসমর্পণ করুন। আপনারা ঘিরে ফেলা হয়েছে।”
গৌতম এবং তার লোকেরা বুঝতে পারল যে পালানোর আর কোনো উপায় নেই।
***
পুলিশ ভেতরে ঢুকে গৌতম এবং তার সাঙ্গপাঙ্গদের গ্রেফতার করল। তন্বী এবং অন্য মেয়েদের উদ্ধার করা হল।
তন্বী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় দেবব্রতকে বলল, “কাকা, আমার ব্যাগে একটা পেনড্রাইভ আছে। সেটায় সব প্রমাণ আছে।”
দেবব্রত সেই পেনড্রাইভ উদ্ধার করলেন। সেখানে সত্যিই গৌতমর পুরো চক্রের তথ্য ছিল। কারা জড়িত, কোথায় তাদের অপারেশন, কত টাকা লেনদেন – সব।
পেনড্রাইভের তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ আরো কয়েকটা রেইড করল। রবীন্দ্র নাথ রায় সহ আরো বেশ কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হল।
সুমিত্রা হাসপাতালে তন্বীর পাশে বসে কাঁদছিলেন। “আমার মেয়ে কত বড় কাজ করেছে। কিন্তু আমি বুঝতেই পারিনি।”
তন্বী মায়ের হাত ধরে বলল, “মা, আমি ঠিক আছি। আর এই কাজের জন্য আমার কোনো অনুশোচনা নেই। অনেক মেয়ের জীবন রক্ষা পেয়েছে।”
***
এক সপ্তাহ পর ‘দৈনিক প্রতিবেদন’ পত্রিকায় তন্বীর লেখা প্রতিবেদন প্রকাশিত হল। “কলকাতার অন্ধকার: মেয়েদের পাচারের এক বিভীষিকাময় চক্র।”