Posts

এলিফ্যান্টদের দেশ – অভীক সরকার

এককালে বিদেশীরা বলতেন, ভারতবর্ষ হচ্ছে স্নেক চার্মার্স আর এলিফ্যান্টদের দেশ। মানে এমন এক পশ্চাদপদ দেশ যেখানে শুধু সাপুড়ে আর হাতি পাওয়া যায়। এককালে হয়ত তাই ছিল। তারপর ব্রিটিশরা নিজেদের প্রয়োজনেই দেশে বিদেশী শিক্ষাব্যবস্থা কায়েম করল। আমরা আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞানের সঙ্গে পরিচিত হলাম। মেকলে সাহেব আজকাল অনেক গালি শোনেন বটে, তবে ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকীকরণের জন্য ভদ্রলোকের অবদান অনস্বীকার্য। ওইটুকুর জন্যই ভদ্রলোকের সাদাচামড়াছাপ উন্নাসিকতাটুকু না হয় ক্ষমাঘেন্না করে অনদেখা করে দিলাম।

এত বছরের বিদেশি শাসনের পরেও ভারতে একটা আশ্চর্য ঘটনা ঘটেছে। সেটা হচ্ছে যে আমরা এত বছর দাসত্বের পরেও আমরা আমাদের দেশজ সংস্কার বা ভারতীয়ত্ব বিসর্জন না দিয়ে, বিদেশি যা কিছু ভালো, যেমন আধুনিক বিজ্ঞানশিক্ষা, ইঞ্জিনিয়ারিং, টেকনোলজি, এসব নিজের মতো আত্মস্থ করতে পেরেছি। কয়েকদিন আগেই আমি ফেসবুকে কোনও একটি রীল-এ নাইজেরিয়ার একজন রাজনৈতিক নেতার বক্তব্য দেখছিলাম। তিনি বলছেন ইন্ডিয়া এবং নাইজেরিয়া দুটোই এককালে বিদেশি শাসিত দেশ ছিল। দুটোই এখন স্বাধীন দেশ। তফাতের মধ্যে নাইজেরিয়ানরা বিদেশের টেকনোলজি বাদ দিয়ে তাদের সমস্ত কিছু আত্তীকরণ করেছে। তাদের কথা,তাদের ভাষা, তাদের পোষাক…সবকিছুই। ভারতীয়রা কিন্তু ভারতীয়ত্ব বজায় রেখে বিদেশীদের ভালোটুকু নিয়েছে এবং তাকে হাজার বছরের সঞ্চিত মেধা, পরিশ্রম দিয়ে অন্য জায়গায় নিয়ে গেছে।

আমাদের আজকের এই অসামান্য সাফল্য, চন্দ্রায়ণ-৩ এর সবিক্রমে চাঁদে পদার্পণ ভারতবাসী হিসাবে নিশ্চয়ই প্রত‍্যেককে গর্বিত করেছে। এ আমাদের ভারতবর্ষের বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির ইতিহাসে যাকে বলে একটি watershed moment. এর ফলে আমি ইমিডিয়েট তিনটে লাভ দেখতে পারছি। তার একটি হচ্ছে, আজকের শিশু/কিশোররা তাত্ত্বিক এবং ফলিত বিজ্ঞান উভয় বিষয়েই পড়তে উৎসাহী হবেন‌। দ্বিতীয়ত, আগামী দিনে ভারত একটা অ্যাফর্ডেবল এবং হাই কোয়ালিটি টেকনোলজি প্রোভাইডার হিসেবে উঠে আসবে। এই সাফল্য ভারতীয় প্রযুক্তিবিদ‍্যার জন্য দুর্দান্ত ব্র‍্যাণ্ডিং। ভারতবর্ষ আইটিকুলির তকমা থেকে বহুদিন আগেই বেরিয়ে এসেছে। পৃথিবীর প্রচুর বড় বড় কোম্পানিতে ভারতীয়রা নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আজকের এই সাফল‍্য ভারতীয় প্রযুক্তির সেই জয়যাত্রাকে অব‍্যাহত রাখবে। তৃতীয়ত, আস্তে আস্তে বিভিন্ন দেশীয় প্রযুক্তি আমরা বিদেশে বিক্রি করতে পারবো, এটা ভারতীয় বিজ্ঞানের মার্কেটের জন্য একটি বড় জয়।

এখানে এখন জানতে হবে যে, বিজ্ঞানের এই জয়যাত্রায় ভারতের এই অসামান্য অবদানের ফলে বিজ্ঞান চেতনায় কতটা জোয়ার আসবে? এর উত্তর দিতে হলে প্রথমে যা বলেছি সেটাই আবার করে বলতে হবে। আমি ব‍্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি যে ভারতবাসীর ডিএনএ-তে ধর্ম ব‍্যাপারটা এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে তাকে বাদ দিয়ে কিছু করা খুব মুশকিল। বৈজ্ঞানিক নাস্তিকতা বলতে আমরা যা বুঝি, তা অনেকটাই পশ্চিমী নাস্তিকতার কপি পেস্ট। ভারতীয়দের বস্তুবাদী দর্শন একটু আলাদা। সাংখ্য একটি বস্তুবাদী দর্শন এবং ভারতীয় ষড়দর্শনশাস্ত্রের অন্যতম একটি অঙ্গ। লোকে বলে ভগবান বুদ্ধ নাকি নাস্তিক ছিলেন। তিনি বেদ মানতেন না সত্য, কিন্তু কর্মফল, জন্মান্তরবাদ মানতেন। তাই নাস্তিক বলতে আমরা যে নিরীশ্বরবাদী, নেতিবাদী দর্শন বুঝি, ভারতীয় বস্তুবাদ তার থেকে সামান্য আলাদা।

তার মানে কি এই যে আমরা ধর্মের নামে প্রচলিত যাবতীয় অনাচার, লোক ঠকানো এসব সহ্য করে নেব? একদমই নয়। যা পাপ তা পাপ, যা ক্রিমিনাল অফেন্স তা ক্রিমিনাল অফেন্স। কিন্তু শুভকাজের আগে মঙ্গলাচরণ ভারতীয়দের জিনগত অভ্যেস। সে থেকে বেরিয়ে আসা ভারী কঠিন।

একটা কথা মেনে নিতে হবে আমাদের যে, তথাকথিত যুক্তিবাদী বিজ্ঞান মনস্কতা আর বৈজ্ঞানিক হওয়ার মধ্যে একটা তফাৎ আছে। যিনি একজন সফল বৈজ্ঞানিক তিনি ব‍্যক্তিগত জীবনে ধর্ম পালন করতে পারেন। আবার যিনি কঠোর যুক্তিবাদী তিনি বিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনা নাও করতে পারেন। একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলি। আজ থেকে সাত আট বছর আগে জ্বরজারিতে নাজেহাল হয়ে সল্টলেকের একটি হাসপাতালে দেখাতে যাই। সেখানে যে ডাক্তারবাবুকে assign করা হয়, তাঁর কেবিনে ঢুকেই দেখি টেবিলে মা কালীর মূর্তি, আর অর্ধেক টেবিল জুড়ে জবাফুল। আমি নিজে ভারী মাতৃভক্ত। মায়ের নামে দু গরাস ভাত বেশী খাই। কিন্তু ডাক্তারের টেবিলে অত মাতৃউপাসনা আমার ঠিক পোষায়নি। আমি অন্য ডাক্তার দেখিয়েছিলাম।

অথচ আমাদের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের মধ্যে অনেকেই ব্যক্তিজীবনে ধর্মপালন করেন। কপালে বিন্দু ধারণ করেন, ত্রিপুণ্ড্রক আঁকেন, নিয়মিত পুজো দেন। তাহলে কি আমরা তাঁদের বৈজ্ঞানিক মেধাকে অস্বীকার করব?

এখানে আমার বক্তব্য এই যে পশ্চিমা নাস্তিকতার মডেল মেনে ভারতীয়দের থেকে ধর্মপালন একেবারে সরিয়ে নেওয়া প্রায় অসম্ভব, সে তিনি বিজ্ঞানী ডাক্তার যেই হোন না কেন৷ এটা ঠিক না ভুল, উচিত না অনুচিত সে প্রসঙ্গে যাচ্ছি না। সে লম্বা তর্কের বিষয়। কিন্তু আমাকে যদি বলা হয় একজন তাত্বিক বিজ্ঞানমনস্কতা চর্চাকারী এবং একজন ততটা-নাস্তিক-নন অথচ সফল বৈজ্ঞানিকের মধ্যে বেছে নিতে, তাহলে আমি ওই ধর্মপালনকারী বৈজ্ঞানিককেই বেছে নেবো। কারণ আল্টিমেটলি তিনি তাঁর কাজটা ডেলিভার করেন। আর যদি তিনি হার্ডকোর নাস্তিক হন, সেক্ষেত্রেও আমার বক্তব্য একই থাকবে কারণ তিনি বা তাঁরা তাঁদের কাজটা সুসম্পন্ন করতে পারছেন কি না সেইটে জরুরি। বিড়াল সাদা না কালো, এই চর্চার থেকে জরুরি এটা জানা যে বিড়ালটি ইঁদুর ধরতে পারছে কি না।

তার বদলে মুক্তচিন্তার নামে, যুক্তিবাদের চর্চার নামে যাঁরা ক‍্যাম্পাসে গাঁজার গাছ লাগাতে ব‍্যস্ত থাকেন, আর কেন সেখানে তাঁদের অবাধ গঞ্জিকাসেবন আর মদ্যপানে বাধা দেওয়া হবে সেই কূটতর্কে ব্যস্ত থাকেন, তাঁদের বরং এই আলোচনার আওতায় না আনাই ভালো। বরং কপালে ত্রিপুণ্ড্রক আঁকা ভারতীয় বিজ্ঞানীরা চাঁদের পর মঙ্গল অভিযানের প্রস্তুতি নিন, এটাই আমার ঐকান্তিক কামনা।

আশা করি আজকের এই অসাধারণ সাফল্য আমাদের শিশুকিশোরদের তাত্বিক এবং ফলিত বিজ্ঞানচর্চার দিকে আরও অনুপ্রাণিত করবে। আমাদের ছেলেমেয়েরা বিশ্বজয় করতে শুরু করেছে। আজকের দিনটা তার অন্যতম উজ্জ্বল সোপান হয়ে থাকুক। আধুনিক বিজ্ঞানের যেসব ফলিত দিকগুলি আছে, যেমন বিগ ডেটা অ্যানালিটিক্স, মেশিন লার্নিং, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, এসব চর্চায় জোয়ার আসুক। আমাদের শতসহস্র বছরের সঞ্চিত ধীশক্তি আর মেধা যেন জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে আমাদের অত্যুত্তম জায়গায় নিয়ে যেতে পারে, ভগবতী ভারতীর কাছে তাই ঐকান্তিক প্রার্থনা। আসুন, আমরা সম্মিলিতভাবে ভারতীয় বিজ্ঞানের এই অতুল্য জয়যাত্রায় সগৌরবে শামিল হই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *