প্রাক শরতের প্রসন্ন ঘামঝরা সন্ধে, মন্দিরতলা থেকে রিকশা ধরে বাঙালপাড়া ফিরছি, হঠাৎ করে চাদ্দিকে চেয়েটেয়ে বুঝলুম যে আদিনাথ আমাকে অহৈতুকী কৃপা করেছেন৷ কারণ প্রফুল্ল চিত্তখানি যে রেটে সাড়ম্বরে উড়তে শুরু করলো তাতেই বুঝলাম যে আমার জ্ঞাননেত্র প্রায় খোলে খোলে আর কি৷ সামান্য ধান্যেশ্বরী সেবনে এত অনায়াসেই এমনতরো মার্কেটিং রিসার্চমার্কা বুদ্ধি গজাচ্ছে দেখলে আমার এম্বিয়ে কলেজের শিক্ষকরা ভারী খুশী হতেন বলেই দৃঢ় বিশ্বাস রাখি৷ তবে কিনা এখন ঘোর কলি, ফলে এবম্বিধ অলৌকিক করিশমা কোনও কাপুর বা খান ছাড়া বিশ্বাস করবেন না বলেই ব্যাপারটা আপনাদের ঝেড়ে জানাতে বাধ্য হচ্ছি যে আমি অদ্য কী আবিষ্কার করিলাম৷
প্রভো, আপনার মতে এখন বাঙালীর সেরা পুজো কী বলুন দেখি?
দুর্গাপূজা? না।
কালীপূজা? উঁহু। আরে না মশাই!
সরস্বতী পূজা? আরে মশাই কুইজে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হারবেন দেখছি ?
কি? গণেশ পুজো? আরে ধুর..গুণতিতেই আসে না।
তাহলে আমি বলছি শুনুন, এখন বাঙালির সেরা পুজো হলো বিশ্বকর্মা পুজো, বুইলেন?
বিশ্বাস হলোনি? হতেই পারে। কারণ এককালে যে কেস মোটেই এরকম ছিলো না, সে কথা হলফ করে বলতে পারি৷ বিশ্বাস না হলে বরং সে কথাটাই বলি শুনুন৷

আমার হাওড়ার বাড়ি যে পাড়ায়, সেটি হচ্ছে GkW মানে গেস্টকীন উইলিয়ামস নামক এককালের এক প্রসিদ্ধ কারখানার গা ঘেঁষে। তারও কোল ঘেঁষে আবার স্যাঙ্কি বলে আরেকটি কারখানা। আমার ছোটবেলায় এই দুই কারখানায় প্রায় কুড়ি হাজার শ্রমিক কাজ করতেন। বলতে গেলে আমাদের দক্ষিণ হাওড়ার অর্থনীতি দাঁড়িয়েইছিলো এদের ওপরে।
আমার এখনও মনে আছে, বিশ্বকর্মা পুজোর দিন বাবার সাইকেলে চেপে গেস্টকীনের ঠাকুর দেখতে যাবার কথা। ওই একদিনই আমাদের অনুমতি মিলতো ভেতরে যাওয়ার, প্রসাদ পাওয়ার৷ তখন ছোট ছিলাম, বিশ্বকর্মা ঠাকুরের মূর্তি অনেক বড় লাগতো, সিপিএম ঠাকুরেরও।
তারপর কোথা হইতে কী হইলো বোঝা গেলো না, পাবলিক দেখিলো যে ওয়ান ফাইন মর্নিং দস্যু মোহনের মতো বাংলার যাবতীয় পুঁজিও কোনও এক অজানা গোপন পথে পলাইয়া গিয়াছে৷ আস্তে আস্তে গেস্টকীন উইলিয়ামস বন্ধ হয়ে গেলো, একে একে ঝাঁপ ফেললো আশেপাশের স্যাঙ্কী, রেমিংটন ইত্যাদি। সেই গাঢ় অন্ধকারে শুধু আরও উজ্জ্বল হয়ে জ্বলতে লাগলো লোক্যাল কমিটির অফিস গুলো। সন্ধের পর বন্ধ হওয়া কারখানার ছায়ায় বসে তেলেভাজা আর চপ সহযোগে রচিত হতে থাকলো গভীর আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রজাল৷ কী করে এই শিবপুরের বিপ্লবী এঁটেল মাটিকে আরও পেছল করে তোলা যায় যাতে ঘৃণিত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ মর্নিং ওয়াকে এলেই সড়াৎ দড়াম ফ্ল্যাট! তখন তার স্টার স্প্র্যাঙ্গলড ব্যানার মার্কা হাপ্প্যান্ট ছাড়িয়ে দুনিয়া কাঁপানো লাল পাজামা পরাতে আর কতক্ষণ? সেইদিন আর দূর নয় বন্ধুউউউ, যেদিন পৃথিবীর কোণে কোণে উড়বে লাল পতাকা, তার কাপড় সাপ্লাই দেবে গেস্টকীন উইলিয়ামসের কাজ হারানো শ্রমিকের ভুখা বউয়ের ছেঁড়া শাড়ি! ওদিকে গেস্টকীন উইলিয়ামসের বন্ধ দরজার ওপারে পরিত্যক্ত মেশিনের গায়ে গজিয়ে ওঠে জংলী লতা, কারখানার শেডের চালে মাথা তোলে কচি অশ্বত্থের চারা৷

কারখানায় ঠিকে শ্রমিকের কাজ করতো নান্টুদা, আপাতত সে গেটের উল্টোদিকেই চায়ের দোকান দিয়েছে৷ সেই দোকানেরই নড়বড়ে বেঞ্চে বসে দিনরাত গভীর বিশ্ববীক্ষণের আলোচনা চলে৷ চীনের পথই কি প্রকৃতপক্ষে জনগণতান্ত্রিক পথ? নাকি সে পথ আদতে নিকষ্যি গণজনতান্ত্রিক? এ বিষয়ে কিউবাতে আয়োজিত পার্টি সমাবেশে গৃহীত দলিলের ৬৯ নং অধ্যায়ের ১০৮ নং অনুদেশে কি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে? মহান ফিদেল কাস্ত্রো এবং লিওনিদ ব্রেজনেভ নান্টুদা’র লাল শাক দিয়ে মোটা চালের ভাত খাওয়া নিয়ে কী বলেছেন, ওটা কাঁচা লঙ্কা দিয়ে খাওয়া উচিৎ না সর্ষে বাটা দিয়ে!
ততদিনে গেস্টকীন উইলিয়ামসের এককালের মুখর যন্ত্রপাতিতে বাসা বাঁধে বড় বড় ইঁদুর, দাঁড়াশ সাপ, জংলী নেউল। দৈত্যাকার ক্রেনের গায়ে ঠা ঠা করে হাসতে থাকে অশ্বত্থের চারা, বিপ্লব ফুটুক না ফুটুক, ভাত বাড়ন্ত! তখন আর বিশ্বকর্মা ঠাকুর আর অতটা বড় লাগেন না, বরং রেভোলিউশন ঠাকুরের হাতে ধরা বিজন সেতুর মশাল আর বানতলার টর্চ আরও বেশী করে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে৷
চ্যাটার্জীহাটের পাঁচশো মিটারের কাঁচা সবজির বাজার আড়ে বহরে প্রসারিত হতে হতে দেড় কিলোমিটার প্রায়, সকালে গেলেই দেখা যায় যে লেদ মেশিনের দক্ষ শ্রমিক অদক্ষ হাতে ট্যাংরা আর পুঁটি মাছ কুটছে। তার সামনে দামী সিল্কের লুঙ্গি পরে দুই জোনাল কমিটির কর্তা আলোচনায় মগ্ন, বিপ্লব যখন এসেই পড়লো, তাকে জমকালো অভ্যর্থনাটা দমদম এয়ারপোর্টেই করলেই ভালো হয় নাকি হাওড়া স্টেশনে? এদিকে লোকসভার ইলেকশন আসে, প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সী জনসভায় জনসভায় চাবির গোছা নাড়িয়ে বলেন যে গেস্টকীনের চাবি ওঁর হাতেই.. হাত চিহ্নে ভোটটি দিলেই..চিচিং ফাঁক! এদিকে গেস্টকীন উইলিয়ামসের অতি বৃহৎ ট্রান্সফরমারগুলির গায়ে লতাপাতার জঙ্গল গজায়, চেরা জিভ বার করে শিকারের গন্ধ শোঁকে গোখরো সাপ। একদিকের পাঁচিল ভেঙে ভেতরে গাঁজা আর সাট্টার আড্ডা বসায় রশিদ ভাইয়ের লোকজন৷

লোক্যাল কমিটির নেত্রীর ছেলের বিয়েতে রশিদ মিঞা খাঁটি জাফরানী বিরিয়ানি সাপ্লাই দেয়। জোগাড়ের কাজ করছিলো নান্টুদা’র ছেলে, অভ্যেস নেই, খাঁটি জাফরানের গন্ধে বমিটমি করে একাকার! লোকে আমলাশোল আমলাশোল করে বাওয়াল দিতে যাচ্ছিলো। ছেলেকে সরিয়ে নিয়ে যেতে যেতে কড়া গলায় ধমকায় নান্টু দা, খবদ্দার পার্টির নামে কিছু বলবি না! নান্টুদার ছেলে পরে টেপ আর পাখা সারাইয়ের দোকান দিয়েছিলো, বিশ্বকর্মা পুজোয় পাঁচশোওও টাকা চাঁদা দিয়ে… সরি নিয়েছিলো লোক্যাল কমিটি।
এরপর আসে একানব্বই, আসে পেরেসত্রৈকা, আসে গ্লাসনস্ত। ইয়েলেতসিন নামের একটা লোক একদিন সত্যিই সদর দপ্তরে দুম করে কামান দেগে দেয়। সেইদিন গেস্টকীন উইলিয়ামসের বন্ধ কারখানার সামনে সে কী জটলা! নান্টুদা শূন্য চোখে চেয়ে আছে কারখানার দিকে। বিপ্লব আসছেই, সারা দুনিয়া জুড়ে পতপত করে উঠছেই লাল পতাকা, এইসব ভেবে যে নান্টুদারা একদিন অচল করে দিয়েছিলো নিজেদের লেদ মেশিন, ভাবেইনি যে তাদের মুখের ওপরেই হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়বে ফালতু স্বপ্নের ভুয়ো ইমারত। যে ইউনিয়ন লীডারের কথায় ইনকিলাব জিন্দাবাদ ধ্বনি তুলে চাক্কা জ্যাম করেছে নান্টুদা’রা, বলেছে যে কিছুতেই কম্পিউটার ঢুকতে দেবে না, শ্রমিকের মেহনতী ঘাম কোনও যন্ত্রকে কাড়তে দেবে না, নান্টুদা দেখলো যে আজ তারই ছেলে মোটা টাকা ক্যাপিটেশন ফী দিয়ে ব্যাঙ্গালোরে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে যাচ্ছে।
বুড়ো ঘোলাটে চোখে নান্টুদা দেখে যে গেস্টকীন উইলিয়ামসের পাঁচিল ভেঙে পড়ে, পাতাখোরদের হাতে লুট হয়ে যায় ইঁট আর জং ধরা যন্ত্রপাতি৷ বিবর্ণ হয়ে যায় হাতির গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়ানো সুকুমার দেবতাটির চেহারা৷ কোন হাতুড়ি ধরা ঠাকুরের পুজো করে এসেছে সে আজ অবধি? গুলিয়ে যায় নান্টুদার৷

আমার বাড়ি থেকে গেস্টকীন উইলিয়ামসের গেটের দূরত্ব আড়াই কিলোমিটার। আজকে এর মধ্যে ক’টা বিশ্বকর্মা পুজো হচ্ছে জানেন? তেরোটা। প্রত্যেকটা রিকশা স্ট্যান্ড, বাস স্ট্যান্ড আর গ্যারেজে বাবার পুজো চলছে। আমার বাড়ির সামনে যে রিকশা স্ট্যাণ্ড আছে সেখান দিয়ে যেতেই দেখি বছর চোদ্দ পনেরো বয়েসের একটা ছেলে মাল খেয়ে উল্লাট নাচছে৷ আমিও চান্স পে সামান্য ডান্স করে নিলাম। ছোকরার সঙ্গে এক ঘর নেচে পাশে সরে এসে ভোম্বলদা’কে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এ ছোকরা কে গুরু?”
ভোম্বলদা ভোম মেরে ছিলো, হাতে একটা স্প্রাইট মেশানো বাংলুর বোতল তুলে দিয়ে বললো, ” স্লা নান্টুদা’র নাতি মাইরি।”
“বয়েস কতো?”
“তেরো।”
“তা নান্টুদা’র নাতি এখানে মাল খেয়ে নাচছে কেন?’
“বাপ তো শেষমেশ রিস্কা চালাতো। ছেলেকে একটা টোটো কিনে দিয়েছে তো, বিসসোকম্মা মায়ের সামনে আজই সুবো উদ্দোধোন৷ স্লা বাপ ব্যাটায় মিলে এবার বাঁ দোহাত্তা কামাবে মাইরি। “
গলায় ঢালা বাংলুটা পুরো গলা জ্বালাতে জ্বালাতে নামলো। তেরো বছর বয়েস ছেলেটার। টোটো চালাবে৷ আমার মেয়ের থেকে মাত্র চার বছরের বড়৷
যাগ্গে, আমার আর কী, বলে বাকি বাংলুটা গলায় ঢেলে নিলাম৷ যে জাতি ডিসাইড করেই নিয়েছে যে ইণ্ডাষ্ট্রি মাত্রেই শোষণের হাতিয়ার, পুঁজির হাত সর্বদাই কালো আর ধ্বংস করাটাই চরম মোক্ষ, তাদের বিশ্বকর্মা পুজো বড় কারখানায় নয়, রিকশা স্ট্যাণ্ডে হওয়াটাই বেটার দেখায়৷ কারণ কবি বলেছেন, রিকশাই আমাদের ভিত্তি, টোটোই আমাদের ভবিষ্যত।
