বচ্ছরকার শেষ দিন। এমন দিনে একখানা রেজোলিউশন সাধারণ্যে ‘ফুকারিয়া না ঘোষিলে’ ব্যাপারটা ভালো দেখায় না বলে অরণ্যে প্রাচীন প্রবাদ আছে। হাজার হোক প্রথা বলে কথা, না মানলে লোকসমাজে কি আর মানইজ্জত থাকে মশাই?
সে যাউকগা, এই কামিং ইয়ারে আমার রেজোলিউশন হল রোগা হওয়া। না না, এতে মুখ টিপে হাসার কিছু নেই। আমি এককালে রীতিমতো রোগা ছিলুম, এই কলেজ লাইফেও। বিশ্বাস না হয় আমার পরিবার পরিজনদের জিগাইতে পারেন।
এই যে আমার তেলেজলেশাঁসে পরিপূর্ণ এখনকার যে চেহারাটি দেখে আপনারা যথেচ্ছ আমোদকৌতুক অনুভব করেন, এমনটি কিন্তু চিরদিন ছিল না। স্কুল কলেজের বন্ধুরা বিশ পঁচিশ বচ্ছর পরের এই আমাকে দেখে বিলক্ষণ ব্যোমকে যায়, ঢেঁড়সের থেকে লাউ বা অন্য সব বিচ্ছিরি বিচ্ছিরি উপমা টেনে আনে, আমি লজ্জাবেগুনী মুখে পালাতে পথ পাই না।
আমি ফুলতে শুরু করলাম চাকরি পাওয়ার পর। কেন ফুলতে শুরু করলাম সে বলা মুশকিল। তবে জনান্তিকে জানিয়ে রাখি অবস্থাগতিকে প্রায় ওই সময়েই আমার বিয়ে হয়। তাই ষাট কেজি থেকে এক বছরের মধ্যেই আশি কেজিতে পৌঁছনমাত্র মা এবং বৌদিদিরা জনান্তিকে বলতে শুরু করলেন ‘এ বিয়ের জল না হয়ে যায় না।’ পূজ্যপাদ পিতৃদেব অবশ্য অন্যমত পোষণ করতেন, তিনি স্পষ্টতই বললেন দেবী ধান্যেশ্বরীর কৃপা। পিতৃদেব প্রাজ্ঞ লোক, ব্যাপারটা ঠিকই আন্দাজ করেছিলেন। বস্তুতপক্ষে প্রায় একই সময়ে আমি সুরারসসিক্ত হয়ে পড়ি। তবে নিজের সুরাসক্তির পাপস্খালনের জন্য স্বীকার করে রাখা ভালো যে এই অধিক ওজনের ব্যাপারটা মাতৃকুলের প্রায় প্রত্যেকেরই আছে, ফলে ব্যাপারটা জিনগত নাকি স্কচগত সে নিয়ে সে নিয়ে একটা কুটিল সন্দেহ মনের মধ্যে চিরকালই আছে।
সে যাই হোক, কথাটা হচ্ছে যে আমার এই ‘মোটাপা’ নিয়ে আমি কেমন সুখে বা দুঃখে আছি সেইটে নিয়ে যথাযথ কাটাছেঁড়া করার জন্য এত বাগ্বিস্তার। লোকজন (পড়ুন বান্ধবীরা, বিশেষত ফেসবুকীয়) যতই আমাকে’গুল্লুমুল্লুচকামচকাই’ বলে আদিখ্যেতা করুন না কেন, ব্যাপারটা যে বিলক্ষণ অসুবিধের সে আর কহতব্য নয়। সামান্য হাঁটলে মনে হয় ফুসফুসটা যেন মুখ দিয়ে লাফিয়ে পড়বে বলে বুকের মধ্যে দৌড় দিয়েছে। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গেলে হাঁটু জবাব দেয়, শয্যায় ঘনিষ্ঠ হতে গেলে গৃহিনী গঞ্জনা দেন, জামাকাপড় বানাতে গেলে দর্জি। ফটো তুলতে গেলে ফটোগ্রাফার বলে ‘নিঃশ্বাস টেনে দাঁড়াবেন’, টোটোতে উঠে একসাইড ঘেঁষে বসলে টোটোওয়ালা গম্ভীরমুখে বলে, “মাঝখানে বসুন, নইলে গাড়ি উলটে যেতে পারে।’ এহ বাহ্য, সেদিন তো ফ্লাইটের টিকিটে বুক করতে গিয়ে দেখি আর্টিফিশিয়ালি ইন্টেলিজেন্ট ফ্লাইট বুকিং সিস্টেম প্রম্পট দিয়েছে, ” উইল ইউ লাইক টু বুক টু সীটস ফর ইউ মিস্টার সরকার?” এরপর অপমানের আর কী বাকি থাকে ফ্রেন্ডস?
তবে বলতে হবে মোটা বলে যত কটু-কাটব্য সয়েছি তার অনেকটাই প্রিয়জনের উদ্বেগসন্নিবিষ্ট। মোটা হওয়া মোটে ভালো না, সে যতই আপনার স্থূলকায় বন্ধু তার সুস্বাস্থ্যবতী বান্ধবী/ স্ত্রীকে নিয়ে ‘আমরা মোটা-মুটি ভালো আছি’ বলে ফেসবুক পোস্ট দিন না কেন। এই আমাকেই ধরুন না কেন, বিচ্ছিরি রকমের নাক ডাকতুম বলে একবার ট্রেনে সহযাত্রীরা ঘুম থেকে তুলে দিয়েছিল। পরে জানলুম আমি নাকি স্লিপ অ্যাপনিয়া নামের একটি অতি বিচিত্র রোগে ভুগি৷ আর সেই রোগটি মূলত হয় বাড়তি ওজন থেকে। সেই থেকে সি-প্যাপ নামের একটি মেশিন আমার চিরস্থায়ী নিদ্রাসঙ্গী, আমার কোমল প্রেমজড়িত শ্বাসস্পর্শ আমার প্রেয়সীর থেকে সেইই বেশি পেয়েছে আজতক!
এছাড়াও বাসে ট্রামে ভীড়ে একান্তশয্যায় মোটা হওয়ার যে বহুবিধ অসুবিধা আছে সে আর না বললেও চলে। আর এই মোটাত্বরও যে জেন্ডার সেনসিটিভ পলিটিকাল কারেক্টনেস আছে সেটা আপনি খেয়াল করেছেন আশা করি। নইলে ওই ‘মোটা-মুটি’ মার্কা অখাদ্য জোক্সটায় পুরুষ বন্ধুকে স্থূলকায় এবং তেনার স্ত্রীসোনামনিকে সুস্বাস্থ্যবতী বলে অভিহিত কেউ এমনি এমনি করে না।।ব্যাপারটা জেন্ডার সেন্সিটিভ সংবেদনশীল পাঠিকামাত্রেই মাত্রেই খেয়াল করবেন বলে আশা করি। নইলে কে কবে ‘বডি শেমিং’,’মিসোজিনিস্ট’ ইত্যাদি ঔচিত্যার্তিতে কাতর হয়ে পড়ে তার কী ‘গ্রান্টি,’ অ্যাঁ?