মানুষের জীবনে কবার প্রেম আসে জানেন? ন্যাড়া বলবে নিদেনপক্ষে উনিশবার৷ কিন্তু আমরা জানি মানুষের জীবনে প্রেম আসে ঠিক তিনবার। হ্যাঁ, আমরা সারাজীবনে মোট তিনজন মানুষের প্রেমে পড়ি। ওই তিনবারই আমাদের জীবন মেপে দেখা, ওই তিনবারই আমাদের মরণ ছুঁয়ে আসা।
আমাদের প্রথম প্রেমটা আসে একেবারে ছেলেবেলায়। শরতের শিউলিফুলের মত একটা মিষ্টি গন্ধ জড়িয়ে থাকে তার শরীর জুড়ে। ওই প্রথম নিজেকে চিনতে শেখা, নিজের মন আয়নায় উঁকি দিয়ে দেখতে শেখা। সেই প্রথম জানা, কাকে বলে মনকেমন। প্রথম দেখা, কাকে বলে চোখের জল।
বঙ্কিম বলেছিলেন বাল্যপ্রেমে অভিসম্পাত আছে। এই প্রেমে কখনও মিলন হয় না৷ অনিবার্য ভাবে একদিন সময়ের জাল দুজনকে দুদিকে টেনে নিয়ে যায়। নরম ব্যথা ধীরে ধীরে আরও অস্পষ্ট হয়ে আসে।
বড় হওয়ার পরে যখন আমরা এই প্রেমটা নিয়ে ভাবতে বসি, তখন মনে হয়, ইশ কী বোকাই না ছিলাম তখন। ধ্যুৎ, ওটাকে কি প্রেম বলে?
হ্যাঁ বন্ধু, একেই প্রেম হলে।
জীবনের দ্বিতীয় প্রেমটা আসে ঝড়ের মত, উদ্দাম হাওয়ার মত, সুনামির জলোচ্ছ্বাসের মত। সে সর্বনাশী আসে কোনও সংকেত না দিয়ে, কাউকে না জানিয়ে। কিছু বোঝার আগেই আপনি দেখেন যে আপনি দামাল হাওয়ার পিঠে সওয়ার। লোকলজ্জার ভয় পেরিয়ে, উচিত অনুচিতের নিগড় ছিঁড়ে আপনাকে নিয়ে যায় জাহান্নামের সাত দরিয়ায়। এই প্রেম আপনাকে কষ্ট দেয়, আপনাকে ছিঁড়েখুঁড়ে রাখে। এই প্রেম আপনাকে যন্ত্রণা দেয়, প্রবল যন্ত্রণা। মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, নীরব বিশ্বাসঘাতকতা, অপমান আর ক্ষতি আপনাকে অন্তর থেকে নষ্ট করে। কিন্তু ঠিক এই প্রেমের ফলেই আমরা এক ঝটকায় বড় হয়ে যাই। বুঝতে পারি, ভালবাসা কেমন হওয়া উচিত! ভালবাসার ক্ষেত্রে আমরা কী ভালবাসি, আর কী ভালবাসি না! আমরা মানুষ চিনতে শিখি! আমরা আরও সচেতন হয়ে যাই। কোনও সম্পর্ক তৈরি করার আগে পাঁচবার ভেবে নিই। এখন আমরা জানি, আমরা কী চাইব, বা চাইব না!
আর তৃতীয় প্রেমটা আসে, মধ্যরাতের সারেঙ্গীতে বাজতে থাকা দরবারি কানাড়ার মতো। অন্ধ বাউলের মতো। শীতের দুপুরের মিঠে রোদের মত। ভাটার টানে ভেসে যাওয়া বিষন্ন নৌকোর মত। রাতের হাস্নুহানার গন্ধের মত সে ক্রমশ আপনাকে জড়িয়ে ধরে। আপনি না চাইলেও সে চুপিসাড়ে আসে, আপনার হাতে হাত রাখে। আপনার ঠোঁটে ঠোঁট রাখে। আপনি না চাইলেও তার শ্যাওলা ও শেকড় সরীসৃপের মতো এসে আপনাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে যাবে। আপনি শত চেষ্টাতেও তাকে আটকাতে পারবেন না। এই ভালোবাসা নীরব আর সর্বগ্রাসী। ধীরে ধীরে আপনার মনের মধ্যে গড়ে তোলা সমস্ত প্রতিবন্ধকতা ভেঙে পড়ে এর সামনে। আপনি না চাইতেও সেই মানুষটার কথা ভাবতে শুরু করেন। তার কেয়ার করতে শুরু করেন। এই মানুষটা হয়তো আপনার কাঙ্ক্ষিত মানুষ নয়, কোনও স্বপ্নপুরীর রাজপুত্র বা রাজকন্যা নয়! তবুও, এই মানুষটার চোখের মধ্যে আপনি রোজ তলিয়ে যেতে থাকেন, তার অপূর্ণতার মধ্যেও খুঁজে পান এক আশ্চর্য সৌন্দর্য। তার সামনে আপনি নিজেকে খোলা বইয়ের মতো মেলে ধরেন। স্বপ্ন দেখেন তার সঙ্গে আজীবন কাটানোর। তাকে কেন্দ্র করেই তৈরি হয় আপনার ছোট্ট পৃথিবী। আর নিজেই নিজেকে বলেন, আহা রে জীবন, আহা জীবন, জলে ফোটা পদ্ম যেমন!