“গীতাপাঠ অপেক্ষা ফুটবল খেলিলে তোমার স্বর্গের আরও নিকটবর্তী হইবে।”
স্বামী বিবেকানন্দ’র এই উক্তিটি বোধহয় এই বীরোত্তম সন্ন্যাসীর সর্বাধিক প্রচারিত ও বিখ্যাত বাণী। সাধারণ্যে এর প্রচলিত অর্থটি হচ্ছে তিনি ধর্মকর্ম অপেক্ষা খেলাধূলায় অধিকতর উৎসাহ দিয়েছেন। যাঁদের চেতনা আরও প্রসারিত হতে হতে স্লাইট কান্নিক মেরে গেছে, তাঁরা আবার হিন্দুধর্মাচরণের বিরোধোক্তিরূপে বক্তব্যটি উপস্থাপিত করেন। সর্বনাশ সমুৎপন্ন হলে পণ্ডিতেরা অর্ধেক ত্যাগ করতে বলেন বটে৷ কিন্তু পণ্ডিতম্মন্যরা বক্তব্যের অর্ধেক নিয়ে বাকি অর্ধেক ত্যাগ করলে যে কী সর্বনাশ ঘটে, এটি তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
স্বামীজীর এই উক্তিটি যেখানে আছে, সেই স্তবকটি নিম্নরূপ,
“হে আমার যুবক বন্ধুগণ, তোমরা সবল হও—তোমাদের নিকট ইহাই আমার বক্তব্য। গীতাপাঠ অপেক্ষা ফুটবল খেলিলে তোমার স্বর্গের আরও নিকটবর্তী হইবে। আমাকে অতি সাহসপূর্বক এই কথাগুলি বলিতে হইতেছে; কিন্তু না বলিলেই নয়। আমি তোমাদিগকে ভালবাসি। আমি জানি, পায়ে কোথায় কাঁটা বিঁধিতেছে। আমার কিছু অভিজ্ঞতা আছে। তোমাদের বলি, তোমাদের শরীর একটু শক্ত হইলে তোমরা গীতা আরও ভাল বুঝিবে। “
অর্থাৎ এই যে সুচিন্তিত বা অচিন্তিত প্রোপাগাণ্ডা, যে স্বামীজী বলেছেন ধর্মকর্ম বিসর্জন দিয়ে শুধুমাত্র খেলতে হবে, ধর্মচর্চার কোনো প্রয়োজন নেই, মূল বক্তব্যটির এর থেকে বেশি ভুল ব্যাখ্যা আর হয় না। তিনি স্পষ্টতই লিখছেন, “তোমাদের বলি, তোমাদের শরীর একটু শক্ত হইলে তোমরা গীতা আরও ভালো বুঝিবে।” অর্থাৎ শেষ উদ্দেশ্য কিন্তু গীতা আরও ভালো বোঝা। সেটা অত্যন্ত স্বাভাবিক কারণ মনে রাখতে হবে স্বামীজী কিন্তু শেষাবধি একজন হিন্দু সন্ন্যাসী। তিনি কখনোই কোনও ক্রিয়াকে প্রশংসা করার জন্য হিন্দুদের মহত্তম ধর্মগ্রন্থ শ্রীশ্রীভাগবৎগীতাকে নীচু দেখিয়ে বা derogate করার কথা বলতে পারেন না। কিন্তু স্বামীজী হঠাৎ ফুটবল খেলার প্রসঙ্গ আনতে গেলেন কেন?
আমরা জানি হিন্দুধর্মে চারটি বর্গ আছে – ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ। এই চারটির একটিও কিন্তু শারীরিক এবং মানসিকভাবে ভাবে দুর্বল মানুষের পক্ষে অর্জন করা সম্ভব নয়। মহাভারতে তো আরো অনেক চরিত্র ছিলেন যাঁরা ন্যায় বা ধর্ম অর্জুনের থেকে অনেক ভালো বুঝতেন, তাও পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকেই এই জ্ঞান কেন দিলেন? কারণ তিনি জানতেন নায়মাত্মা বলহীনেন লভ্য। যিনি দুর্বল, তাঁর পক্ষে আত্নজ্ঞান লাভ করা অসম্ভব। বীর অর্জুনের মধ্যে সেই শারীরিক ও মানসিক ক্ষমতা ছিল যা লব্ধ মহাজ্ঞানকে কর্মে রূপান্তরিত করার সামর্থ্য রাখে। গীতা তো শুধু ভক্তির কথা বলে না, জ্ঞান ও কর্মের কথাও বলে।
স্বামীজীর বক্তব্য পুরোটা পড়লে বোঝা যায় যে স্বামীজী সবসময়ই চাইতেন যে দেশের মানুষ আগে স্বাস্থ্যবান ও কর্মঠ হোক তবে তো দেশের জন্য কাজ করতে পারবে। যখন স্বামীজী এ কথা বলেছিলেন তখন ভারত পরাধীন। পরাধীন জাতির দুর্দশা, দুর্বলতা, ক্লীবত্ব, দাসত্ব, দাস মনোভাব তাঁকে পীড়িত করতো, ব্যথিত করতো। সেইজন্য তিনি বলেছিলেন আগে শরীর সবল করতে হবে। শরীর সবল করলে তবেই ধর্মে কর্মে মতি হবে। স্বামীজীর আরও একটি উক্তি এখানে উল্লেখ করা হয়ত অপ্রাসঙ্গিক হবে না,
“আমি চাই এমন লোক—যাদের পেশীসমূহ লৌহের ন্যায় দৃঢ় ও স্নায়ু ইস্পাত-নির্মিত, আর তার মধ্যে থাকবে এমন একটি মন, যা বজ্রের উপাদানে গঠিত। বীর্য, মনুষ্যত্ব—ক্ষাত্রবীর্য, ব্রহ্মতেজ! “
গীতায় তো এই ক্ষত্রতেজেরই উদ্বোধন, মহৎ উদ্দেশ্যের প্রণোদনা, নিষ্কাম কর্মের জয়গান। কিন্তু তা হৃদয়ঙ্গম করার আগে নিজেকে শারীরিক ও মানসিক ভাবে উপযুক্ত আধার হিসেবে গড়ে তোলা আবশ্যক। নাহলে গীতা শুধু পড়াই সার হবে।
আমার আরও একটি বক্তব্য দিয়ে প্রসঙ্গটি শেষ করব। যাঁরা এই কথাটি বলে হিন্দুঘাতীশ্লাঘা বোধ করেন যে স্বামীজী গীতা না পড়ে ফুটবল খেলতে বলেছেন, তাঁদের মধ্যে কজন ফুটবল খেলে স্বর্গের নিকটবর্তী হওয়ার চেষ্টা করেছেন, সে নিয়ে কিন্তু ঘোর সন্দেহ আছে!