হিন্দিতে একটা শব্দ আছে, ভেলা৷ মানে যার কোনও কাজ নেই, নিষ্কর্মা। যেমন ধরুন বান্দা বিলকুল ভেলা ব্যয়ঠা হ্যায়। অর্থাৎ লোকটার কোনও কাজ নেই। চুপচাপ কর্মহীন সময় কাটাচ্ছে।
বাঙালীর মত ভেলা জাতি পৃথিবীতে দুটি আছে কি না সন্দেহ। দুর্গাপূজার আগে বিভিন্ন অর্থহীন কুতর্ক আর বাকবিতণ্ডা দেখে সে বিশ্বাসে দৃঢ় প্রত্যয় জাগতে বাধ্য। হুদুরবুদুরের অশ্লীল প্রোপাগাণ্ডার ন্যারেটিভ স্রোত স্তিমিত হতে না হতেই ‘আজকের এই অ্যাক নতুন’ রূপে দেখা দিয়েছে মহালয়া শুভ না অশুভ-এই কুতর্ক। যেন এই অতীব দুরূহ সমস্যাটির সমাধানের ওপরেই নির্ভর করছে জাতির ভবিষ্যত। এর একটা সুরাহা হলেই ঝট করে পৌঁছে যাব দুগ্ধমধুপ্রবাহিনী কন্যান প্রদেশে। সেখানে গোলাভরা ধান, গোয়ালভরা গরু, পুকুরভরা মাছ, মুখভরা হাসি, গ্লাসভরা বিপি। সেদেশে সকলই নবীন সকলই নীতিশ, ইয়ে বিমল। সেখানে চলতে গেলেই দলতে হয় রে দুর্বা কোমল, দোয়েল আর ফিঙের নাচ দেখে মনে হয় ‘তবু ভরিল না চিত্ত’! সেখানে আকাশ ভরা সূর্যতারা, চারিদিকে ঘাসের ওপর ছড়িয়ে থাকে শান্তিকল্যাণ, ইত্যাদি প্রভৃতি। মোটমাট একটা ওয়াও ব্যাপার আর কি!
দেখেশুনে বড় আমোদ লাগে। এই একটা সম্পূর্ণ অর্থহীন, তুচ্ছ, ইনসিগনিফিকেন্ট আলোচনায় মত্ত হয়ে আমাদের কোনও মোক্ষ সাধিত হচ্ছে ঈশ্বরই জানেন। সেই দাপুটে ভদ্রলোকের কথা মনে পড়ে যায়, যিনি বলেছিলেন তাঁর পরিবারে সমস্ত বড় বড় সিদ্ধান্ত তিনিই নেন। যেমন কেন্দ্রীয় সরকারের বাজেট কেমন হওয়া উচিত, শচীনের কেমনভাবে ব্যাট ধরা উচিত, কীভাবে বিশ্বরাজনীতিতে আমেরিকার দাদাগিরি খর্ব করা যায় ইত্যাদি। আর সমস্ত ছোটখাটো সিদ্ধান্ত ওঁর স্ত্রী নেন৷ যেমন রোববারে পাঁঠা হবে না সোয়াবিন, মেয়ে আর্টস নেবে না সায়েন্স, ননদের ছেলের বিয়েতে জামদানি যাবে না গামছা ইত্যাদি। আমাদেরও এক্কেরে সেই অবস্থা। পৃথিবীর সমস্ত দুরূহ, জটিল, intriguing বিষয়ে আমরাই সিদ্ধান্ত নিই, যেমন ব্রিটেনের অভিবাসন পলিসি, প্যালেস্টাইন সমস্যার সমাধান, মোজাম্বিকের আখ চাষিদের দুর্দশা, হুদুরবুদুর, মহালয়া সত্যিই শুভ কী না ইত্যাদি। আর সমস্ত তুচ্ছ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে অন্যরা, যেমন আমাদের হাতে হ্যারিকেন থাকবে নাকি কেতাদুরস্ত ল্যাপটপ, পাতে আলুপোস্ত থাকবে না শাহী মোর্গ মুসল্লম, খাটে দত্ত বা মজুমদার থাকবে নাকি আগারওয়াল আর কাপুর, এই সব ছোটখাটো ব্যাওয়ার আর কী।
প্রশ্নটা হচ্ছে প্রায়রিটির। মানে কোন আলোচনা বা এনগেজমেন্ট আমাদের জন্য অধিক ফলপ্রদ সেইটে বেছে নেওয়ার সেন্স। যে প্রশ্নের উত্তরে আমরা চিরকাল শূন্য পেয়ে এসেছি। এই মহালয়া শুভ অশুভ কুতর্ক তার জ্বলন্ত উদাহরণ। আরে দাদা দিদিরা, যার ইচ্ছে মহালয়াকে শুভ মনে করতে সে করবে৷ যার ইচ্ছে নেই সে করবে না। এ নিয়ে এত ঝড়ঝঞ্ঝাবজ্রপাতের দরকারটাই বা কী? কেউ যদি উইশ করে, চেপে যাবেন। এ নিয়ে তো সাড়ে সাত পাতার সন্দর্ভ রচনার দরকার নেই! মানে এই সময়টা তো অন্য প্রোডাক্টিভ কাজেও ব্যয় করা যায়। একটা তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয় নিয়ে এত নর্তনকুর্দন, অর্থহীন বাগাড়ম্বরের দরকারটাই বা কী? এসব দেখেশুনে মনে হয় এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হওয়া উচিত, বাঙালী কি সত্যিই ভেলা?